‘জোছনা ও জননীর গল্প’ নিয়ে কক্সবাজার বন্ধুসভার পাঠচক্র

কক্সবাজার বন্ধুসভার পাঠচক্রের আসর
ছবি: বন্ধুসভা

একটি বই। কয়েকটি চরিত্র। আর তার ভেতর দিয়ে উঠে আসে একটি জাতির সবচেয়ে গৌরবময় ও বেদনাবিধুর সময়ের গল্প। কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের কালজয়ী উপন্যাস ‘জোছনা ও জননীর গল্প’ বইটির পাতা ওলটাতে ওলটাতে পাঠকের সামনে যেন ফিরে আসে ১৯৭১–এর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, সাধারণ মানুষের ত্যাগ, ভয়, অনিশ্চয়তা এবং স্বাধীনতার আনন্দ-বেদনার সেই দিনগুলো।

‘জোছনা ও জননীর গল্প’ উপন্যাসটি নিয়ে পাঠের আসর করেছে কক্সবাজার বন্ধুসভা। ৫ আগস্ট কক্সবাজার নিউজ-সিবিএন অফিসের হলরুমে এই আসর বসে।

মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাসটি নতুন প্রজন্মের পাঠকদের মধ্যেও সাড়া জাগিয়ে চলেছে। কাল্পনিক চরিত্রের পাশাপাশি ঐতিহাসিক সত্য ঘটনা ও বাস্তব চরিত্রের সংমিশ্রণে রচিত বইটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টি। বইটির পটভূমি ও বর্ণনা পাঠকের মনে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে নতুনভাবে অনুভব করার সুযোগ তৈরি করে।

সভাপতি আবদুল নবী বলেন, বইটিতে শুধু মুক্তিযুদ্ধের গল্প নেই; লেখক ইতিহাসের সত্য ঘটনা ও বাস্তব দলিলও তুলে ধরেছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান, মাওলানা ভাসানী, নিয়াজি কিংবা জুলফিকার আলী ভুট্টোর মতো ঐতিহাসিক চরিত্রগুলোর ভূমিকা এখানে দারুণভাবে চিত্রিত হয়েছে। ইতিহাসকে শুধু তথ্য হিসেবে জানা আর গল্পের ভেতর দিয়ে অনুভব করার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ‘জোছনা ও জননীর গল্প’ সেই অনুভূতির জায়গাই তৈরি করেছে।

সাধারণ সম্পাদক উলফাতুল মোস্তফা বলেন, হুমায়ূন আহমেদ যুদ্ধক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার লড়াইকে চমৎকারভাবে দেখিয়েছেন। শাহেদ বা ইরতাজউদ্দিনের মতো চরিত্রের মধ্য দিয়ে অবরুদ্ধ ঢাকার সাধারণ নাগরিক ও গ্রামীণ মানুষের ভয়, অনিশ্চয়তা ও মনস্তাত্ত্বিক রূপ ফুটে উঠেছে। যুদ্ধ এখানে শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়। যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে মানুষের ঘরে, পরিবারে, সম্পর্কের মধ্যে এবং প্রতিদিনের বেঁচে থাকার সংগ্রামে।

পাঠাগার ও পাঠচক্র সম্পাদক আয়েশা সিদ্দিকা বলেন, ২৫ মার্চের কালরাতের গণহত্যা এবং পুরো ৯ মাস ধরে চলা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম নির্যাতনের এক জীবন্ত এবং বেদনাদায়ক ছবি এই উপন্যাস। এটি পড়ার সময় মুক্তিযুদ্ধের সেই ভয়াবহতা পাঠককে মানসিকভাবে নাড়া দেয়। এ সময় তিনি আরও বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানেও আমরা এমন কিছু বর্বরতা দেখেছি, যা আমাদের দৃঢ়ভাবে মুক্তিযুদ্ধের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।’

যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মারগোব মূর্শেদ বলেন, বইটির অন্যতম বড় শক্তি হলো লেখকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ছোঁয়া। হুমায়ূন আহমেদ নিজে এবং তাঁর পরিবার যেভাবে মুক্তিযুদ্ধের সময় বন্দিদশা ও কষ্টের মুখোমুখি হয়েছিলেন, সেই বাস্তব অনুভূতিগুলোই বইটিকে আরও বেশি জীবন্ত ও আবেগঘন করে তুলেছে। ফলে ‘জোছনা ও জননীর গল্প’ শুধু ইতিহাসের একটি উপন্যাস নয়, হয়ে উঠেছে মানুষের অনুভূতি, ভয়, ভালোবাসা, অপেক্ষা এবং বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষার গল্প।

পাঠচক্রে বইটির বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন বন্ধুসভার সদস্যরা। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, উপন্যাসের চরিত্র, লেখকের নির্মাণশৈলী এবং সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম উঠে আসে আলোচনায়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন অর্থসম্পাদক হুমায়ুন কবির, মুক্তিযুদ্ধ ও গবেষণা সম্পাদক আল আমিন, প্রশিক্ষণ সম্পাদক মুজিবুল হাসান, সদস্য এম আর সিফাত, মোহাম্মদ সোহাগ, মাহমুদুল্লাহ প্রমুখ।

সভাপতি, কক্সবাজার বন্ধুসভা