রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার মোহনপুর ইউনিয়নের বাবুডাইং আলোর পাঠশালা। প্রথম আলো ট্রাস্ট পরিচালিত পাঠশালাটির মূল প্রাঙ্গণজুড়ে নানা প্রজাতির বৃক্ষ। কিন্তু পাঠশালায় আসার এক কিলোমিটার রাস্তা যেন বিরান মরু! কালো পিচঢালা সড়কের দুই পাশজুড়ে চাষের জমি, নেই কোনো গাছ। প্রখর রোদে এই রাস্তা দিয়ে পাঠশালায় যাওয়া-আসা বেশ কষ্টসাধ্য। পিচঢালা পথের দুই পাশে এবার অর্ধশতাধিক গাছের চারা রোপণ করেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ বন্ধুসভা। শুধু এ রাস্তাই নয়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার ঝিলিম ইউনিয়নের বিলবৈঠা গ্রামে সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের বসতঘরের বৃক্ষহীন চারপাশ গাছে গাছে ভরিয়ে তুলতে প্রতিটি বাড়িতে দুটি করে গাছের চারা বিতরণ করেছে।
ময়মনসিংহের রামগোপালনগর গ্রামের আড়াই কিলোমিটার সড়কে গেলেই চোখে পড়বে নানা প্রজাতির অসংখ্য গাছ। ময়মনসিংহ বন্ধুসভার বন্ধুরা দুই মাস ধরে এসব গাছ রোপণ করেছেন। এ বছর তাঁরা প্রায় পাঁচ হাজার বৃক্ষ রোপণ করেছেন পুরো ময়মনসিংহ শহরে। রোপণ থেকে শুরু করে গাছগুলো রক্ষণাবেক্ষণেও কাজ করছেন বন্ধুরা।
ঠাকুরগাঁও বন্ধুসভার বন্ধুরা শহরের কলেজ রোডের সংযোগস্থল থেকে শুরু করে প্রায় দুই কিলোমিটার সড়কের বিভাজকজুড়ে শতাধিক গাছের চারা রোপণ করেছেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে তিন বছর ধরে বৃক্ষহীন এই সড়ক বিভাজকে রোপণ করা গাছগুলো বাঁশের বেষ্টনী দিয়ে নিয়মিত পরিচর্যা করছেন বন্ধুরা। সবুজ কচি পাতার দোল শুধু দৃষ্টিই নয়, শহরবাসীর প্রাণেও শীতল পরশ ছড়িয়ে দিচ্ছে।
বন্ধুসভা জাতীয় পর্ষদের আহ্বানে ও কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে ‘পৃথিবী একটাই, আসুন গাছ লাগাই’ স্লোগান ধারণ করে আষাঢ়, শ্রাবণ ও ভাদ্র মাসজুড়ে গাছের চারা রোপণ করেন বন্ধুরা। এ বছর ১৩০টি বন্ধুসভার মধ্যে সারা দেশের ৬৫টি বন্ধুসভা এই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করে। বিগত বছরের তুলনায় এবার কার্যকর বৃক্ষরোপণের দিকে বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়। তাই কার্যক্রমের শিরোনামও ছিল ‘কার্যকরী বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি ২০২২’।
এই মহাযজ্ঞে সারা দেশে মোট ৩০ হাজার ৯৫৬টি গাছ রোপণ করা হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বন্ধুসভা চন্দনাইশ, হাটহাজারী ও চট্টগ্রাম শহরে ১০ হাজারের বেশি বৃক্ষ রোপণ করে। মোট গাছের মধ্যে ১৩ হাজার ৭৪৮টি বনজ, ৯ হাজার ৫১০টি ফলদ ও ৩ হাজার ৯৩৮টি ঔষধি। বাস্তুসংস্থানের ভারসাম্য বজায় রাখতে কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অনুযায়ী গাছের চারা বাছাই করা হয়। দুই দফায় বন্ধুসভার ফেসবুক পেজ থেকে সরাসরি বৃক্ষরোপণ-সংক্রান্ত বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়। বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির সমন্বয়ক ফাহমিনা বর্ষার সঞ্চালনায় জাতীয় পর্ষদের সভাপতি উত্তম রায়, সাধারণ সম্পাদক জাফর সাদিক, জাতীয় পর্ষদ এবং মহানগরের বন্ধুরা বৃক্ষরোপণ বিষয়ে পরামর্শ প্রদান করেন। বন্ধুসভার ওয়েবসাইট, ফেসবুক পেজ ও ছাপা কাগজের পাতায়ও এ-সংক্রান্ত যাবতীয় নির্দেশনা প্রকাশ করা হয়। এ ছাড়া বাংলাদেশ সরকারের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ও ঢাকা মহানগর বন্ধুসভার উপদেষ্টা ফাল্গুনী মজুমদার পরিবেশবান্ধব বৃক্ষ এবং সেগুলোর উপকারিতা বর্ণনার পাশাপাশি পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর বৃক্ষ সম্পর্কে বন্ধুদের অবহিত করেন।
এ বছরের কর্মসূচিতে বন্ধুরা নিজেরা বৃক্ষরোপণের পাশাপাশি জনসাধারণকে উৎসাহী করতে ব্যতিক্রমী নানা কার্যক্রম পরিচালনা করেন। জামালপুর ও রংপুর বন্ধুসভা কুইজ ও বিতর্ক প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের পুরস্কার হিসেবে গাছ উপহার দিয়েছে। দিনাজপুর বন্ধুসভা ঐতিহ্যবাহী কান্তজিউ মন্দিরের প্রবেশসড়কের দুই পাশে, গাজীপুর বন্ধুসভা টঙ্গীর সামন্তপুর রেলপথের প্রায় ৪ কিলোমিটার জায়গাজুড়ে বনজ গাছ রোপণ করে। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধুসভা বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদ-সংলগ্ন রাস্তায় বৃক্ষরোপণ করে প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে সড়কটির নাম দেয় ‘বন্ধু রাস্তা’।
পঞ্চগড় বন্ধুসভা মুজিবনগর আশ্রয়ণ প্রকল্পের প্রতিটি বাড়িতে একটি করে বৃক্ষ রোপণ করে। পার্বতীপুর বন্ধুসভা স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ প্রাঙ্গণ, মেঠো পথ ও রাস্তার পাশে, বাগান ও মাঠে গাছ লাগানোর পাশাপাশি স্থানীয় কবরস্থানসহ শহরের বিভিন্ন স্থানে গাছ রোপণ করেছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া বন্ধুসভা বেওয়ারিশ কবরস্থানজুড়ে বৃক্ষরোপণ করেছে। এভাবেই সারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চল সবুজে সুশোভিত করার প্রত্যয়ে গাছ লাগিয়ে চলছেন বন্ধুসভার বন্ধুরা।
জাতীয় পরিচালনা পর্ষদের সার্বিক তত্ত্বাবধানে এবং কার্যকরী বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি ২০২২-এর সমন্বয়ক ফাহমিনা বর্ষার নেতৃত্বে ঢাকা মহানগর বন্ধুসভার আহসান আরিফ, তৌহিদ ইমাম, শাহিদা আলম, অনিক সরকার, গাজী আসিফ, এস. কে কাব্য ও জাহিদ ফেরদৌস পুরো কর্মসূচি সমন্বয় করেন।
ম্যাগাজিন সম্পাদক, জাতীয় পরিচালনা পর্ষদ