লেখক শোনালেন ‘দিনাজপুরে ভাষা আন্দোলন’ বই লেখার গল্প

দিনাজপুর বন্ধুসভার সাহিত্য আলোচনা ও বইপাঠের আসরছবি: বন্ধুসভা

ভাষাশহীদদের স্মরণ এবং ভাষা আন্দোলনের চেতনা বন্ধুদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে সাহিত্য আলোচনা ও বইপাঠের আসর করেছে দিনাজপুর বন্ধুসভা। ২১ ফেব্রুয়ারি জাতীয় শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে প্রথম আলো দিনাজপুর অফিসে এটি অনুষ্ঠিত হয়।

উপস্থিত ছিলেন দিনাজপুরের গুণী লেখকেরা। তাঁদের পেয়ে বন্ধুসভার বন্ধুরা প্রাণবন্ত হয়ে ওঠেন। মনোযোগ দিয়ে লেখকের আলোচনা শোনেন। ‘দিনাজপুরে ভাষা আন্দোলন’ বইয়ের লেখক মোফাজ্জল বিশ্বাস শুরুতেই ভাষা নিয়ে বিস্তর আলোচনা করেন।

শুরুতেই লেখক তাঁর শারীরিক অবস্থা নিয়ে কথা বলেন। লেখক নিজেও বেশ হাস্যোজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত মনের। তিনি বন্ধুসভার বন্ধুদের ইতিহাস সম্পর্কে পড়ার কথা বলেন। মোফাজ্জল বিশ্বাস জানান, ‘দিনাজপুরে ভাষা আন্দোলন’ বইটি তিনি কেন এবং কীভাবে লেখা শুরু করেন। লেখক কল্পনাপ্রেমী, তিনি মূলত ভাবেন দিনাজপুরে সবাই যে শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা এবং সম্মান জানায়, শিক্ষার্থীরা আসলে কাঁদেরকে সম্মান জানায়? ১৯৫২–এর ভাষা আন্দোলনে শুধু কি ঢাকার শিক্ষার্থীরাই অংশ নিয়েছিলেন? নাকি দিনাজপুরেরও শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী মানুষ ছিল?

দিনাজপুর বন্ধুসভার সাহিত্য আলোচনা ও বইপাঠের আসর
ছবি: বন্ধুসভা

লেখক দিনাজপুরের মানুষদের জানানোর জন্য তাঁর এই বইটি লিখেন। কেমন ছিল ’৫২–এর ভাষা আন্দোলন, কেমন ছিল দিনাজপুর, দিনাজপুরের কার কার অবদান ছিল এই আন্দোলনে। মোফাজ্জল বিশ্বাস আরও জানান, বইটি লিখতে সময় লেগেছে প্রায় ছয় বছর! এই দীর্ঘ সময়ে তিনি ছুটে গেছেন সাংবাদিক, শিক্ষক–শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সবার কাছে, তথ্য সংগ্রহ করেছেন। এত বছরের পরিশ্রম ও সাধনার ফল ‘দিনাজপুরে ভাষা আন্দোলন’ বইটি।

আলোচনায় উঠে আসে ‘চেতনগড়’ শব্দটি। ‘আঁধার পোড়ানো কোরাস’ বইয়ে লেখকের ‘চেতনগড়’ নামে একটি কবিতা আছে। চেতনগড় অর্থ চেতনার গড়। অর্থাৎ মনের ভেতরে সুরক্ষিত থাকা যে চিন্তা স্থায়ী। একই বইয়ে তাঁর মিছিল নামেও একটি কবিতা আছে। এ সময় তিনি বন্ধুদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন।

মোফাজ্জল বিশ্বাস জানান, দিনাজপুরে ভাষা আন্দোলনের উদ্যোক্তা হলেন প্রেম হরি বর্মণ। তিনি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর বন্ধু ছিলেন। আইন বিভাগের ছাত্র ছিলেন। পরে দিনাজপুরে প্রথম আইন পেশায় নিয়োজিত হন। ১৯৪৭ সালের ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন রহিম উদ্দিন আহমেদ। ভাষা আন্দোলনের ১১ জনের কমিটি ছিল। তার মধ্যে অন্যতম তিনজনই ছিলেন দিনাজপুরের (গোলাম রহমান, মোহাম্মদ সুলতান, এম আর আখতার মুকুলসহ), মির্জা গোলাম হাফিজ, মোস্তফা নুরুল ইসলাম, কমরেড ফরহাদ। মোফাজ্জল বিশ্বাস বলেন, ‘বাংলা ভাষা আমাদের বাঙালির সংস্কৃতি। সংস্কৃতিকে রক্ষার জন্যই আমাদের এই আন্দোলন।’

দিনাজপুর বন্ধুসভার সাহিত্য আলোচনা ও বইপাঠের আসর
ছবি: বন্ধুসভা

দিনাজপুরের অন্যতম লেখক আযাদ কালাম তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘আমাদের বাঙালি বলা হয় কেন? মূলত বঙ্গভূমিতে যাদের জন্ম, তারা জন্মসূত্রে বাঙালি। বাঙালিরা বাংলা ভাষায় কথা বলে। আর আমাদের বাসভূমি বাংলাদেশ। আমরা বঙ্গসন্তান। তিনি বলেন, ‘বাংলা ভাষার একটা প্রাকৃতিক প্রাণশক্তি আছে। তাই এ ভাষা কখনো মরে না।’

তিনি লেখক মোফাজ্জল বিশ্বাস সম্পর্কে বলেন, ‘হয়তো মোফাজ্জল বিশ্বাস চিরদিন থাকবে না। কিন্তু থেকে যাবে তাঁর এই সৃষ্টি, বই। যা দিনাজপুরবাসীর কাছে স্মৃতির মাইলফলক হয়ে থাকবে।’

প্রথম আলো দিনাজপুর প্রতিনিধি শৈশব রাজু সাহিত্য আলোচনা ও পাঠের আসরকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলেন তাঁর জ্ঞানমূলক কথার মাধ্যমে। তিনি ভাষা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেন। বন্ধুদের উদ্দেশে বলেন, ‘বন্ধুরা এই বইটি সম্পূর্ণ পড়বেন এবং ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে জানার এই সুযোগকে কাজে লাগাবেন। অনেক অজানাকে জানবেন এই বই পাঠের মাধ্যমে।’

শেষে দিনাজপুর বন্ধুসভার সভাপতি শবনম মুস্তারিন লেখকদের সামনে তুলে ধরেন বন্ধুসভার বছরব্যাপী করা বিভিন্ন কার্যকলাপ। তিনি বলেন, ‘আমরা বন্ধুরা আমাদের সাহিত্য আলোচনার এই ধারা অব্যাহত রাখব। স্বেচ্ছাসেবার পাশাপাশি বই পাঠ আমাদের বন্ধুদের সমৃদ্ধ করছে।’

এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন সাধারণ সম্পাদক বিপ্লব চন্দ্র রায়, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহিন নেওয়াজ, সাংগঠনিক সম্পাদক রাকিব সরকার, বন্ধু জুঁই আফরোজ, বিধান রায়, শুভ রাম, ইমজামামসহ অন্য বন্ধুরা।

সভাপতি, দিনাজপুর বন্ধুসভা