বন্ধুসভা মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াড ২০২৬
শিক্ষার্থীদের মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানতে হবে, বই পড়তে হবে
১৯৭১ সালে ৯ মাস যুদ্ধ করে আমরা একটি স্বাধীন দেশ পেয়েছি। এই স্বাধীনতা অর্জনের জন্য ৩০ লাখ প্রাণ দিতে হয়েছে ও দুই লাখ মা-বোনদের সম্ভ্রম হারাতে হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সেই সময়ের নির্যাতনের স্মৃতি এখনো মনে পড়লে গা শিউরে ওঠে। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে ধারণ করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।
আজ বুধবার সকালে নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগ ভুঁইয়ার বাগ এলাকায় অবস্থিত বিদ্যানিকেতন হাইস্কুলে ‘বন্ধুসভা মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াড-২০২৬’ অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন বীর মুক্তিযোদ্ধারা। এটির আয়োজন করেছে নারায়ণগঞ্জ বন্ধুসভা।
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা হালিম আজাদ তাঁর বক্তব্যে বলেন, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে বর্বরোচিত হামলার পর ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ থেকে মানুষ প্রাণ বাঁচাতে বক্তাবলী ইউনিয়নে আশ্রয় নেয়। সে সময় দশম শ্রেণির ছাত্র হিসেবে তিনি ও তাঁর সহযোদ্ধারা গ্রামের মুরব্বিদের নিয়ে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও খাবারের ব্যবস্থা করেন এবং গুরুতর আহত ব্যক্তিদের নৌকায় মুন্সিগঞ্জে পাঠান।
হালিম আজাদ বলেন, ’৭১ সালের জুন মাসের শেষের দিকে কমান্ডার সিরাজুল ইসলামের অধীনে অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ নেন। তাঁদের আটজনের একটি দল বুড়িগঙ্গা নদীর ওপারে প্রথম অপারেশনে রাজাকারদের ক্যাম্পে আগুন দেন এবং পরে আরও কয়েকটি অভিযানে অংশ নেন।
হালিম আজাদ আরও বলেন, ১৯৭১ সালের ২৯ নভেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বক্তাবলী এলাকা নদীর তিন দিক থেকে ঘিরে ফেলে আক্রমণ চালায়। তাঁরা প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। পরে তাঁরা গ্রামের ৮০ শতাংশ মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেন। ভোরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ১৩টি গ্রাম গানপাউডার দিয়ে আগুন দেয় এবং ১৩৭ জনকে হত্যা করে। দুই শতাধিক মানুষকে আহত করে। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘তোমরা নৈতিক আদর্শবান শিক্ষায় শিক্ষিত হবে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানবে, নিজেকে বেগবান করবে। নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ধারণ করে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।’
নারায়ণগঞ্জের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বি বলেন, ‘আমাদের চিন্তাচেতনার বেড়ে ওঠার সবকিছু ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। আমাদের রাষ্ট্রক্ষমতায় যাঁরা থাকেন, তাঁরা ইতিহাসকে তাঁদের পক্ষে নেওয়ার জন্য ইতিহাস বদলে দিতে চান। যার ফলে রাষ্ট্র বদলের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ইতিহাসও বদলে যেতে থাকে।’ তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানতে হবে, মুক্তিযুদ্ধের বই পড়তে হবে। মুক্তিযুদ্ধের গ্রন্থগুলোর পাঠের মধ্য দিয়ে তোমরা ইতিহাসকে জানবে। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের হাজার বছরের ইতিহাসের একটি গৌরবগাথা।’
মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ উল্লেখ করে বীর মুক্তিযোদ্ধা লক্ষ্মী চক্রবর্তী বলেন, ‘তরুণ বয়সে পারিবারিক চেতনার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি। ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদ এবং ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে আমরা একটি স্বাধীন দেশ পেয়েছি। মুক্তিযুদ্ধের সেই সময়ের নির্যাতনের স্মৃতি মনে পড়লে এখনো গা শিউরে ওঠে।’
লক্ষ্মী চক্রবর্তী বলেন, ‘আমাদের দেশ অনেক সময় নানা পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। এই পরিস্থিতিকে আমাদের মোকাবিলা করতে হবে। আমাদের নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতে হবে। যাতে তারা দেশপ্রেমের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হতে পারে। আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় যতই উজ্জীবিত হব, এই জাতিকে তত উন্নতির দিকে নিতে পারব।’
নারায়ণগঞ্জ জেলা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি আবদুস সালাম বলেন, ‘মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে সারা দেশে বন্ধুসভা মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াড আয়োজন করছে, এটি নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। মুক্তিযুদ্ধকে যখন ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হয়, তখন প্রথম আলোর এ উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। এতে আমাদের আগামীর নতুন ও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানতে আগ্রহ সৃষ্টি হবে।’
বিদ্যানিকেতন হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক উত্তম কুমার সাহা বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ আমাদের গর্বের ও অহংকারের বিষয়। মুক্তিযুদ্ধ না হলে আমরা স্বাধীনতার লাল সূর্যটাকে ধরতে পেতাম না। আমাদেরকে পরাধীন থাকতে হতো।’
উপস্থিত ছিলেন বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদের মুক্তিযুদ্ধ ও গবেষণা সম্পাদক আশফাকুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘আমাদের তরুণেরাই ভবিষ্যৎ নির্মাণের মূল শক্তি। এই তরুণেরা শিক্ষা, সংস্কৃতি, বই পড়া ও খেলাধুলা, বিনোদনের মধ্য দিয়ে প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠবে। এ লক্ষ্যে সারা দেশে মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াড আয়োজন করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ শুধু ইতিহাস নয়, এটি আমাদের জাতির আত্মপরিচয় ও অহংকার। এই উপমহাদেশের মধ্যে বাংলাদেশ একমাত্র দেশ, যে দেশের মানুষ যুদ্ধ করে রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা এনেছে।’
আশফাকুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের তরুণেরা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শিক্ষার্থী। যেকোনো আন্দোলন–সংগ্রামে তারা সবার আগে এগিয়ে আসে। আমাদের তরুণেরা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গল্পগুলো পড়বে, উপন্যাসগুলো পড়বে, মুক্তিযুদ্ধের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যগুলো পড়বে, কবিতাগুলো পড়বে, গান শুনবে, নানাভাবে নিজেকে সমৃদ্ধ করবে। এভাবে সে যখন নিজেকে সমৃদ্ধ করবে, তখন নিজে একজন বড়মাপের মানুষ হতে পারবে এবং বড় মানুষ হলেই আমাদের দেশের জন্য ভূমিকা রাখতে পারবে।’
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসভিত্তিক কুইজ প্রতিযোগিতায় মোট ৮০ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। প্রাথমিক বাছাই শেষে ৫ জন শিক্ষার্থীকে বিজয়ী হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। প্রথম হয়েছে সজীব দাস, দ্বিতীয় সায়লা আক্তার, তৃতীয় উম্মে হানি অনি, চতুর্থ তরিকুল ইসলাম এবং পঞ্চম হয়েছে ওমেরা তাসমির। সবাই বিদ্যানিকেতন হাইস্কুলের শিক্ষার্থী। পরে বিজয়ীদের হাতে মুক্তিযুদ্ধের গল্পের বই উপহার দেওয়া হয়। এর আগে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্রথম আলোর নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি মজিবুল হক, বন্ধুসভার সভাপতি সাব্বির আল ফাহাদ, সহসভাপতি জহিরুল ইসলাম, সাবেক সহসভাপতি সোহেল হাওলাদার, প্রশিক্ষণ সম্পাদক হাসান আল ইমরান, সদস্য বোরহান উদ্দিন, ইউসুফ কবির, আমির খান সাব্বির, সাকিব, গাজী ওমর ফারুক, জাহিদ মিয়াজী ও জিসান।
‘মুক্তিযুদ্ধের আলোয় জাগ্রত তারুণ্য’ স্লোগানে নতুন প্রজন্মের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, তাৎপর্য ও মূল্যবোধ ছড়িয়ে দিতে মার্চজুড়ে প্রথমবারের মতো দেশব্যাপী মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াডের আয়োজন করেছে বন্ধুসভা। এর অংশ হিসেবে ২৬ মার্চ সবার জন্য অনলাইন কুইজ প্রতিযোগিতা এবং প্রথম আলোর ওয়েব পেজ ও বন্ধুসভার ফেসবুক পেজে প্রতিদিন কুইজ প্রতিযোগিতা ও পুরস্কারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।