শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘বড়দিদি’ নিয়ে পাঠচক্রের আসর করেছে ময়মনসিংহ বন্ধুসভা। ১৭ এপ্রিল বিকেলে ময়মনসিংহ গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরিজ স্কুল মাঠের বকুল চত্বরে এটি অনুষ্ঠিত হয়।
পাঠ আলোচনায় পাঠাগার ও পাঠচক্র সম্পাদক আল ইমরান বলেন, গল্পের প্রধান পুরুষ চরিত্র সুরেন্দ্রনাথ। ধনী পিতার পুত্র। সৎমায়ের অধিক যত্ন আর আদরে শুধু লেখাপড়া ছাড়া আর কোনো কাজ সে করতে পারত না। করা লাগত না। ধনীর সন্তান হওয়াতে এবং সৎমায়ের অধিক নজরদারিতে পৃথিবীর আর স্বাভাবিক মানুষের মতো সে কিছু শিখে উঠতে পারেনি। বেখেয়ালি এবং নিজের প্রয়োজনের প্রতি অসচেতন অনেকটা। কিন্তু তার সহজ সরল, গরিব-দুঃখীর প্রতি সহানুভূতিশীল হৃদয় ছিল। নিজের মেধায় এবং সৎমায়ের অধিক চেষ্টায় সে অল্প বয়সেই এমএ পাস করে। বন্ধুর প্ররোচনায় বিলেত যাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও মায়ের জন্য পারেনি। সেই ক্ষোভে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়।
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বোরহান উদ্দিনের আলোচনায় উঠে আসে, গল্পের প্রধান নারী চরিত্র মাধবী। সেই সময়ে জমিদারি প্রথা ছিল। জমিদার ব্রজরাজের মেয়ে মাধবী। ১১ বছর বয়সে বিয়ে হয়ে ১৪ বছরেই বিধবা হয়। এরপর বাবার বাড়িতে থাকে। সুরেন্দ্রনাথ যখন এই বাড়িতে আসে তখন তার ষোলো কি সতেরো হবে বয়স। রূপে, গুণে, স্নেহ, মমতা, ভালোবাসায় মাধবী এক অনন্য চরিত্র। বেখেয়ালি সুরেন্দ্রর বিপরীত গভীর চরিত্র মাধবী। জীবনের কঠিন দিক সম্পর্কে অনভিজ্ঞ সুরেন্দ্রর ঘটনাক্রমে মাধবীর সাত বছরের ছোট বোনের শিক্ষক হিসেবে জায়গা হয় জমিদার ব্রজরাজের বাড়িতে।
কাহিনির শুরু মূলত এখান থেকেই। এই বাড়িতে সবাই দায়িত্ব-কর্তব্য পালনে দক্ষ পরিবারের অল্প বয়সের বড় মেয়ে মাতৃহীন মাধবীকে বড়দিদি বলে। সব কাজের জন্য সবাই তার ওপরেই নির্ভরশীল এবং তার থেকেই নির্দেশ পেতে অভ্যস্ত। মাধবী বাইরের লোকের সামনে খুব একটা যায় না। সবার মতো সুরেন্দ্রও না-দেখা মাধবীর প্রতি সব কাজে নির্ভরশীল। মাধবীও বেখেয়ালি এবং নিজের প্রয়োজন সম্পর্কে অসচেতন না-দেখা সুরেন্দ্রর প্রতি দূর থেকেই খেয়াল রাখে। ছোট বোনের মাধ্যমে কথোপকথনের দ্বারা তাদের ভেতর একটা অদৃশ্য কিছু অনুভূতি তৈরি হয়। কিন্তু একসময় যে কাজের জন্য সুরেন্দ্র এই বাড়িতে আসে সেই কাজ ঠিকমতো পালন না করায় মাধবী দ্বারা তিরস্কৃত হয়ে সুরেন্দ্র সেই বাড়ি থেকে চলে যায়। এরপর কয়েক বছর দেখা না হওয়া, সুরেন্দ্রর বাবার মৃত্যুর পর তার বাবার জমিদারি পাওয়া এবং সেই সূত্র ধরে পুনরায় মাধবীর সঙ্গে দেখা হওয়া— এভাবেই কাহিনি এগিয়ে যায়।
সহসভাপতি রাবিয়াতুল বুশরা বলেন, গল্পটা বড় পরিসরের না। কিন্তু ভীষণভাবে টেনে নিয়ে গেছে। বিধবাবিবাহ নিষিদ্ধ সময়ের গল্প ‘বড়দিদি’। অল্পবয়সী বিধবাদের কঠিন আর রুদ্ধ জীবনের গল্প এটা। ভালোবাসার অধিকার তাদের থাকে না। কোনো পুরুষ ভালোবেসে তাদের চাইতেও পারে না। তবু তাদের জীবনে ভালোবাসা আসে। সেই ভালোবাসায় বিরহ একমাত্র সঙ্গী হয়ে রয় হয়তো।
পাঠচক্রে আরও উপস্থিত ছিলেন সাধারণ সম্পাদক উম্মে সালমা, প্রশিক্ষণ সম্পাদক মুনমুন আহমেদ, কার্যনির্বাহী সদস্য সরকার সাদমান, নুসরাত আহমদসহ অন্য বন্ধুরা।
সভাপতি, ময়মনসিংহ বন্ধুসভা