বৃক্ষে গড়ি আগামী
টানা বৃষ্টিতে লালমনিরহাট সদর ও রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার সীমান্তবর্তী হরিণচওড়া মাঝের চরে পানি থই থই করছিল। এ চরে ‘আলোর পাঠশালা’ নামে একটি স্কুল পরিচালনা করে রংপুর বন্ধুসভা। সম্প্রতি এই বৃষ্টির মধ্যে সেখানে আম, মেহগনি, কড়ই, নিমগাছসহ ৫০০টি ফলদ ও বনজ গাছের চারা নিয়ে যান বন্ধুসভার সদস্যরা। স্কুলের শিক্ষার্থী ও স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে নিয়ে তাঁরা চরের বিভিন্ন স্থানে চারাগুলো রোপণ করেন এবং কিছু চারা বিতরণ করেন।
স্কুলের ছোট ছেলেমেয়েরা নিজেদের হাতে রাস্তার ধারে বনজ গাছ রোপণ করে। রোপণের পর গাছ সুরক্ষিত রাখতে প্রতিটি গাছে খুঁটি দেওয়া হয়। গাছ হাতে পেয়ে শিশুদের উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো। অনেককে কাঁধে গাছ নিয়ে বাড়িতে ফিরতে দেখা যায়। শিক্ষার্থী জেসমিন আনন্দ প্রকাশ করে বলে, ‘এই আমগাছ দুইটা বাড়ির উঠানে লাগামু। বেড়া দিমু, পানি দিমু, আম হইলে আম খামু।’
বজ্রপাতের ঝুঁকি কমানো, মাটির ক্ষয় রোধ ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সদর উপজেলার চারটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আশপাশের এলাকায় ১০০টি তালগাছের চারা রোপণ ও বিতরণ করে কুড়িগ্রাম বন্ধুসভা। এ ছাড়া আরও তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রাঙ্গণে ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের ৭০০টি চারা রোপন ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ করে তারা।
‘বৃক্ষ শুধু রোপণ নয়, যত্ন নিয়ে বাঁচাতে হয়’ প্রতিপাদ্যে দেশব্যাপী চলছে প্রথম আলো বন্ধুসভার বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি। জুন মাস থেকে শুরু হওয়া এ কর্মসূচি চলবে আগস্ট পর্যন্ত। সারা দেশের শতাধিক বন্ধুসভা এ কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছে। বন্ধুসভার সদস্যরা নিজেদের ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের অর্থে এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এ ছাড়া ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্স প্রায় ২০ হাজার গাছের চারা দিয়ে সহযোগিতা করেছে।
বন্ধুরা শুধু গাছ রোপণ ও বিতরণই করছেন না, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরিবেশ নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে নানা উদ্যোগও হাতে নিচ্ছেন। যেমন নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধুসভা ক্যাম্পাস–সংলগ্ন সোনাপুর শহীদ স্মৃতি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আয়োজন করেছে বৃক্ষরোপণের গুরুত্ব নিয়ে বিশেষ সেমিনার ও কুইজ প্রতিযোগিতা। কুইজ বিজয়ীদের উপহার হিসেবে দেওয়া হয়েছে গাছের চারা। পরে স্কুল প্রাঙ্গণে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিয়ে চারা গাছ রোপণ করেন বন্ধুসভার সদস্যরা।
পাঁচ ধাপে বৃক্ষরোপণ করেছে দিনাজপুর বন্ধুসভা। এর মধ্যে ছিল বীরগঞ্জ উপজেলার জয়গঞ্জ খেয়াঘাট এলাকার ফাঁকা সড়কের দুই পাশ এবং স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা রোপণ, দুটি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে দুটি করে গাছের চারা উপহার, সদর উপজেলার সরকারি দুটি আশ্রয়ণ প্রকল্পে গাছের চারা রোপণ ও বিতরণ, এবং বন্ধুসভার বন্ধুদের মধ্যে চারাগাছ বিতরণ। তাঁরা সেগুলো নিজ নিজ বাড়ির আঙিনায় রোপণ করেন।
সিলেট নগরের চাঁদনীঘাট এলাকায় (কিন ব্রিজের নিচে) বৃক্ষ উৎসব করে সিলেট বন্ধুসভা। বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি ও সাধারণ পথচারীদের মধ্যে বিনা মূল্যে ২ হাজার ১০টি চারা গাছ বিতরণ করা হয়।
বৃক্ষ উৎসব ও বৃক্ষমেলা করেছে দয়ালনগর বন্ধুসভা। পাবনার বেড়া উপজেলার স্থানীয় স্কিলস একাডেমি বিডি প্রাঙ্গণে সপ্তাহব্যাপী এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। মেলায় আগত শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিনা মূল্যে গাছের চারা বিতরণ করা হয়।
সুন্দরবন-সংলগ্ন খুলনার কয়রা উপজেলার মসজিদকুঁড় গ্রামের সাত শতাধিক গাছের চারা রোপণ ও স্থানীয় লোকজনের মধ্যে বিতরণ করেছে কয়রা বন্ধুসভা। উপকূলের মানুষের জীবনযাত্রা ও বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই চারার প্রজাতি নির্বাচন করা হয়। আম, আমড়া, নিম, কড়ই, অর্জুন, মেহগনিসহ বিভিন্ন প্রজাতির ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের পাশাপাশি ছিল গোলাপ, বকুল ও কৃষ্ণচূড়ার চারাও।
চট্টগ্রামের পটিয়া স্কুল ও পটিয়া সরকারি কলেজ ক্যাম্পাসেও বৃক্ষরোপণ করেছেন বন্ধুরা। পটিয়া বন্ধুসভার সদস্যরা নিজ হাতে সেখানে আমলকী, কৃষ্ণচূড়া, পেয়ারা, নিম, চালতাগাছের চারা রোপণ করেন। উপস্থিত ছিলেন পটিয়া সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যাপক আবদুল আলিম। তিনি বলেন, বৃক্ষকে ভালোবাসা মানে জীবনকে ভালোবাসা। আর জীবন ভালোবাসা মানে বৃক্ষকে ভালোবাসা।
এ ছাড়া এরই মধ্যে বৃক্ষরোপণ ও বিতরণ করেছে জাতীয় পরিচালনা পর্ষদ, নীলফামারী, চাঁদপুর, ঠাকুরগাঁও, গাইবান্ধা, রাঙ্গুনিয়া, জামালপুর, গাজীপুর, মিরপুর, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, কেরানীগঞ্জ, গণ বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা, বরিশাল, সাভার, পাবনা, কুলাউড়া, যশোর ও নড়াইলসহ অন্যান্য বন্ধুসভা।