সারাক্ষণ বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করেন সবুজ মিয়া। নিজের শক্তিতে উঠে বসারও সামর্থ্য নেই। পাঁচ বছর আগে গাছ থেকে পড়ে ভেঙে যায় মেরুদণ্ডের হাড়। সেই থেকে বিছানাই তাঁর পৃথিবী। অভাবের সংসার, তিন শিশুসন্তান, আর অসহায় স্ত্রী—দুর্ঘটনায় পঙ্গু হওয়ার পর এভাবেই কাটছে জীবন। চিকিৎসার অভাবে অচল হয়ে পড়েছে দুই পা। পরিবারের উপার্জনক্ষম মানুষটি এখন নিজেই অন্যের সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল। এমন পরিস্থিতিতে তাঁকে একটি হুইলচেয়ার উপহার দিয়েছে খুলনা বন্ধুসভা।
প্রথম আলোর ২৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ‘একটি ভালো কাজ’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে এই কার্যক্রম করেছেন বন্ধুরা। ২৩ অক্টোবর বিকেলে খুলনা দিঘলিয়া উপজেলার পানিগাতী ইউনিয়নে সবুজের বাড়িতে গিয়ে তাঁরা হুইলচেয়ারটি পৌঁছে দেন।
একসময় দিনমজুরি করে সংসার চালাতেন সবুজ মিয়া। স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে পাঁচ সদস্যের পরিবারে অভাব ছিল, কিন্তু বেঁচে থাকার অবলম্বন ছিল তাঁর পরিশ্রম করার সামর্থ্য। প্রায় পাঁচ বছর আগে একটি দুর্ঘটনা সেই সামর্থ্য কেড়ে নেয়। এখন নিজের পায়ে দাঁড়ানো তো দূরের কথা, বিছানা থেকে উঠে বাইরে যাওয়ারও উপায় নেই।
সবুজের পরিবারের দারিদ্র্যের চিত্র আরও বেদনাদায়ক। পৈতৃক সূত্রে পাওয়া বসতভিটার জায়গাটুকু ছাড়া আর কোনো জমিজমা নেই। সংসারের বড় ছেলে মাত্র ৯ বছর বয়সেই স্থানীয় একটি পাটকলে হেলপারের কাজ করছে। সপ্তাহে তার আয় মাত্র এক হাজার ৩০০ টাকা। যে বয়সে স্কুলে যাওয়ার কথা, সহপাঠীদের সঙ্গে খেলাধুলা করার কথা, সেই বয়সে তাকে পরিবারের অভাব ঘোচানোর জন্য শ্রম দিতে হচ্ছে। অন্যদিকে সবুজের স্ত্রী অন্যের বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করে যা পান, তা দিয়ে কোনো রকমে সংসার চালানোর চেষ্টা করেন।
খুলনা বন্ধুসভার সহসভাপতি হাফিজুর রহমান বলেন, ‘যে যার অবস্থান থেকে সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতার মাধ্যমে সম্পূর্ণ নিজেদের অর্থায়নে খুলনা বন্ধুসভার বন্ধুরা সবুজ মিয়ার জন্য একটি হুইলচেয়ারের ব্যবস্থা করেছি। আমাদের আশা, এর মাধ্যমে তিনি ঘরের বাইরে আসতে পারবেন, আলো-বাতাসে কিছুটা সময় কাটাতে পারবেন। সম্ভব হলে ভবিষ্যতে আয়ের কোনো পথ খুঁজে নেওয়ার সুযোগও তৈরি হতে পারে। এতে তাঁর বেঁচে থাকার সংগ্রাম কিছুটা হলেও সহজ হবে।’
বন্ধুসভার পক্ষ থেকে হুইলচেয়ার হস্তান্তরের সময় আবেগাপ্লুত হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন সবুজ মিয়ার মা। তিনি বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ বাপু। দুয়া ছাড়া তোমাগো আর কিচ্ছু দেবার নেই আমার। আল্লা তোমাগে ভালো করুক।’
দুচোখ দিয়ে অনর্গল পানি বিসর্জন ছাড়া আর কিছুই বলতে পারেননি সবুজ মিয়ার স্ত্রী। চোখের পানিই যেন তখন হৃদয়ের হাজারো শব্দের প্রতীক হিসেবে বেরিয়ে এল।
হুইলচেয়ার পেয়ে হাসিমুখে সবুজ মিয়া বলেন, ‘এই কডা বছর ধরে বিছানায় পড়ে আছি। হুইলচেয়ারডা দে আমার মেলা কাজে লাগবেনে। এটা দে আমি পিথিবির আলো বাতাস দেখব।’
কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন সাধারণ সম্পাদক ফারজানা যুথি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোহা. রহমাতুল্লাহ ও ইমন মিয়া, অর্থ সম্পাদক অনির্বাণ সরকার, পাঠাগার ও পাঠচক্র সম্পাদক শাম্মী আক্তার, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি সম্পাদক জুঁই আক্তার, কার্যনির্বাহী সদস্য ফারিহা ঝিলাম, বন্ধু তানভীন সুলতানা, এম এম আব্দুল্যাহ আল মামুন, আবু হানিফা, নাজমুস সাকিব, সালাউদ্দীন সাবাদ, শাহারিয়ার সাদিক, ঝিলিক প্রমুখ।
সাবেক সভাপতি, খুলনা বন্ধুসভা