পৌঁছে দেখি শহীদ মিনার তার সাধারণ রূপে নেই। সাধারণত সারা রাত এখানে লোকের সমাগম থাকে, তবে আজ কেমন জনশূন্য। আমরা গিয়ে এক পাশে বসলাম। প্রথম বর্ষের দিনগুলোর স্মৃতিচারণায় ডুবে যাই। তখন প্রায়দিনই আমরা একসঙ্গে অনেক জন আসতাম, গল্প করতাম। দীর্ঘদিন হলো আর আসা হয় না। যে যার মতো ব্যস্ত।

হঠাৎ লক্ষ করলাম, শহীদ মিনারের সামনের অংশে ছোট একটা জটলা। উৎসুক হয়ে সেদিকে ছুটে গেলাম। একটা ছেলে অচেতন হয়ে পড়ে আছে। লোকজন পানি ছিটিয়ে জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করছে। পাঁচ মিনিট পর তার জ্ঞান ফেরে। তবে কথা বলতে পারছিল না। মুখ থেকে কটু গন্ধ আসছে, সঙ্গে লালা বের হচ্ছে। নাম জিজ্ঞাসা করেও কোনো উত্তর পেলাম না। আবার বললাম, ‘তোমার বাসা কই?’ সে জানাল নাজিমুদ্দিন রোড। বাসার নম্বর মনে নেই। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। জবাব শুনে মনে হলো, মিথ্যা বলছে। বয়স আমাদের মতোই হবে। আবার বলছে, ওর নাকি কিছুই মনে থাকে না, এমনকি নিজের মা–বাবার মুঠোফোন নম্বর বা বাড়ির ঠিকানাও। একটা রহস্যের গন্ধ পেলাম।

প্রথমে পোশাক ও চেহারা দেখে মাদকাসক্ত মনে হয়নি। নিশ্চিত হতে ওর পকেটে হাত দিলাম। তন্নতন্ন করে খুঁজেও কিছুই পেলাম না। সন্দেহ আরও জোরালো হলো। হয়তো তাঁকে ছিনতাইকারী ধরেছিল। পকেট পুরো ফাঁকা। এরই মধ্যেই ছেলেটা আবারও অজ্ঞান হয়ে পড়েছে। কেউ সাহায্য করছে না। সবাই দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছে। কী হয়েছে বোঝা যাচ্ছে না। তবে সে যে অসুস্থ, তা স্পষ্ট। হাসপাতালে নেওয়া দরকার। একটা রিকশা ডেকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেলে রওনা হলাম। ছেলেটা নেতিয়ে পড়েছে। সারা গায়ে ধুলা, আর মুখ থেকে লালা পড়ছে।

শহীদ মিনার থেকে ঢাকা মেডিকেল মাত্র দুই মিনিটের পথ। দ্রুতই পৌঁছে গেলাম। গেটে দায়িত্বরত আনসার সদস্যদের সঙ্গে কথা হলো। তাঁরা পুলিশের কাছে গিয়ে সাহায্য নেওয়ার পরামর্শ দিলেন। দ্রুত ছেলেটাকে নিয়ে জরুরি বিভাগে গেলাম এবং পুলিশকে সব জানালাম। কিন্তু তাঁরা দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানায়। পুলিশের কথায় নিরুৎসাহিত হয়ে ভাবলাম ছেলেটাকে এভাবেই রেখে চলে যাব।

এদিকে সিঁড়িতে নিথর হয়ে পড়ে থাকা ছেলেটার আশপাশে অনেক লোক জড়ো হয়ে গেছে। উৎসুক জনতার ভিড় থেকে একজন বলল ৯৯৯ নম্বরে ফোন দিতে। ফোনে শাহবাগ থানার অফিসার ইনচার্জ মাহবুবুর রহমান আমাদের বললেন, ছেলেটাকে ভর্তি করে প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে। ততক্ষণে তিনি চলে আসবেন বলে আশ্বাস দেন। ১০ টাকা দিয়ে টিকিট কেটে আনলাম। যার জন্য এত কিছু করছি, তার নামটা পর্যন্ত জানি না। আর জানবই-বা কীভাবে? টিকিটে নাম লেখালাম ‘অজ্ঞাত’। এখন প্রয়োজন একটা ট্রলির। কিন্তু আরেক ঝামেলা। টাকা ছাড়া ট্রলি নেওয়া যাবে না। বেশ অবাক হলাম। একটা দেশের শীর্ষ সরকারি হাসপাতালে ট্রলিও ভাড়া নেওয়া লাগে! রোগী মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে আর ওদিকে ট্রলির জন্য দর–কষাকষি চলছে! প্রায় ১৭-১৮ মিনিট খোঁজাখুঁজির পর একটা ট্রলি পেলাম। ছেলেটাকে ট্রলিতে তুলে সোজা আইসিইউতে।

তার নাম ইব্রাহিম। কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পর জানাল মাদক খেয়েছে। কথাটি শুনেই রাগে সবার সামনে ছেলেটার গালে কয়েকটা চড় বসালাম। শান্ত স্বরে সে বলল, ‘ভাই, আপনাকে যদি কেউ এভাবে চড় মারে, আপনি কি ব্যাথা পাবেন না?’এর আগে অনেক মাদকাসক্ত দেখেছি। একজন মাদকাসক্ত তো এমন শান্তশিষ্টভাবে কথা বলতে পারে না। মাদক নেওয়ার কারণ জিজ্ঞাসা করলাম। সে বলল, ‘বন্ধুরা জোর করে খাইয়েছে। তারপর ওরা আমার মুঠোফোন ও টাকা নিয়ে গেছে। আমাকে মেরেছে।’ এবার সব জট খুলতে লাগল। ‘আমি রাত ১১টার দিকে বের হই বাসা থেকে। বন্ধুরা কল দিয়েছিল। বলেছে, শহীদ মিনারে আড্ডা দেবে। তারপর তারা আমাকে মাদক নিতে বলে। আমি খেতে চাইনি, আমাকে মেরে জোর করে খায়িয়েছে। তারপর আর কিছু মনে নেই। জ্ঞান হারিয়ে ফেলি।’একটানা বলে যায় ইব্রাহিম।

রাত ১টা বেজে ২৪ মিনিট। নাজিমুদ্দিন রোডের তাদের বাসায় পৌঁছালাম। বাসার দরজা খোলা। কলবেল দিতেই ওর মা উৎকণ্ঠা ভরা চেহারা নিয়ে হাজির। ছেলেকে দেখে চিন্তা দূর হলেও কর্কশ গলায় ইব্রাহিমকে জিজ্ঞাসা করল, ‘এত রাতে কোথা থেকে এলি, আর এই ছেলেগুলো কারা?’ ইব্রাহিম চুপ করে রইল। আমরাই পরিচয় দিলাম। তিনি আমাদের ভেতরে নিয়ে বসালেন। ভদ্রমহিলা জানালেন, তাঁদের ছেলে রাতে বাড়ি থেকে কখনো বের হয় না। আজই এমন হলো। ছেলেটা সুস্থ- স্বাভাবিক নয়। কিছুই মনে রাখতে পারে না। সবকিছুই ভুলে যায়। এমনকি বাসার নম্বরটাও। তারপর পুরো ঘটনা ওর মাকে খুলে বললাম। তাঁর চোখে তখন পানি।

ছেলেটার মায়ের কথা শুনে মনে হচ্ছিল আজ সত্যিই কোনো ভালো কাজ করতে পেরেছি। পরে রিকশায় করে ফিরে এলাম। তখন রাত ২টা ৪০ মিনিট।

বন্ধু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধুসভা