বন্ধুসভা মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াড ২০২৬
স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে হৃদয়ে ধারণ করে তা রক্ষা করতে হবে
‘একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা শুধু স্বাধীনতাই পাইনি, মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা পেয়েছি একটি মানচিত্র। আমরা আমাদের অধিকার এবং জাতি হিসেবে নিজস্ব সত্তার ভিত্তি স্থাপন করতে পেরেছি। এই স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে হৃদয়ে ধারণ করে তা রক্ষা করতে হবে। বর্তমান প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানাতে হবে এবং হৃদয়ে ধারণ করতে হবে।’
নীলফামারীতে ‘বন্ধুসভা মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াড ২০২৬’ অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন নীলফামারী ছমির উদ্দিন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মো. মেজবাহুল হক। তিনি বলেন, ‘দেশের আগামী দিনের নেতৃত্ব দেবে আজকের তরুণেরা। তাই পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের বই পড়তে হবে। মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানতে হবে। কোনো আন্দোলনকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। টেকসই বাংলাদেশ গড়তে আমাদের সঠিক ইতিহাস জানতে হবে এবং তা ধারণ করতে হবে।’
আজ রোববার দুপুরে শহরের ছমির উদ্দিন স্কুল অ্যান্ড কলেজে এই অলিম্পিয়াডের আয়োজন করে নীলফামারী বন্ধুসভা। অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা বঙ্কু বিহারী রায় ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. সহিদুল ইসলাম। ‘মুক্তিযুদ্ধের আলোয় জাগ্রত তারুণ্য’ স্লোগানে নতুন প্রজন্মের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, তাৎপর্য ও মূল্যবোধ ছড়িয়ে দিতে মার্চ মাসজুড়ে প্রথমবারের মতো দেশব্যাপী মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াডের আয়োজন করছে প্রথম আলো বন্ধুসভা।
মুক্তিযোদ্ধা বঙ্কু বিহারী রায় বলেন, ‘আমরা স্বাধীনতা দিবস ২৬ মার্চ বললাম, আর হয়ে গেল, এমন তো নয়। দেশকে স্বাধীন করতে গিয়ে যে কষ্ট, যে ত্যাগ আমরা স্বীকার করেছি, তা বলার মতো নয়। পাশের দেশ ভারত, তাদের ভাষা হিন্দি। তাদের রাস্ট্রব্যবস্থা ভিন্ন ছিল। তবু আমরা ভিন্ন দেশে ভিন্ন ভাষায় কষ্ট করে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি। কারণ, নিজেদের দেশের স্বার্থে আমরা এই ত্যাগ স্বীকার করি। আমরা হিন্দু–মুসলিম সবাই একসঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করি। সেই সময় আমাদের কোনো সাম্প্রদায়িকতা ছিল না। আমরা বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে, জিয়াউর রহমান সাহেবের ঘোষণায় সবাই একত্র হয়ে ৯ মাস যুদ্ধ–সংগ্রাম করি।’
বঙ্কু বিহারী রায় বলেন, ‘দীর্ঘ ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদ আর দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে আমরা এই স্বাধীনতা পেয়েছি। বর্তমান প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানাতে হবে। কারণ, আজকের এই তরুণেরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ।’
মুক্তিযোদ্ধা মো. সহিদুল ইসলাম বলেন, ‘১৯৭১ সালে দেশমাতৃকার টানে যখন মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ি, তখন আমার বয়স মাত্র ১৪ বছর। আমি সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। আজ এখানে আমরা যারা আছি, তাদের উদ্দেশে বলতে চাই, আজও আমরা মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস বলতে পারি না। আমরা নিজেদের স্বার্থে নিজেদের সুবিধার জন্য মনগড়া কথা বলি। যা পরবর্তী সময়ে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শেখানো হয়।’
মো. সহিদুল ইসলাম বলেন, ‘দ্বিজাতি তত্ত্ব থেকে আমাদের ওপর বৈষম্য শুরু করে পশ্চিম পাকিস্তান। প্রতিটি সেক্টরে আমাদের সঙ্গে অন্যায় করা হয়। আমাদের দেশে আয় হয়; কিন্তু তারা ভোগ করে। এই বৈষম্যের প্রথম শিকার ভাষার ওপর আঘাত। আমাদের মাতৃভাষাকে কেড়ে নিয়ে উর্দুকে রাস্ট্রভাষা করা হলো। তখন ’৫২ সালে ভাষা আন্দোলন হলো। রক্ত দিয়ে বাংলা ভাষা কেনা হলো। পর্যায়ক্রমে যুক্তফ্রন্ট গঠন করা হলো। ’৬৬–এর ছয় দফা, ’৭০–এর নির্বাচন। ’৭১ সালের ২৫ মার্চ সার্চলাইটের নামে নিরস্ত্র শান্তিকামী বাঙালির ওপর হত্যাযজ্ঞ শুরু করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। এরপর আমরা আপামর জনতা পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ি। আমরা ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে এসে সম্মুখযুদ্ধে জড়াই। দীর্ঘ ৯ মাসের সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে এদেশকে স্বাধীন করা হয়।’
নীলফামারী বন্ধুসভার সভাপতি রুবি বানুর সভাপতিত্বে প্রথম আলো প্রতিনিধি মীর মাহমুদুল হাসানের সঞ্চালনায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন নীলফামারী বন্ধুসভার উপদেষ্টা প্রকৌশলী জুলফিকার আলী, পঞ্চপুকুর বালিকা উচ্চবিদালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. বাবুল হোসেন, ছমির উদ্দিন উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক আফসানা আফরোজ, কালীতলা উচ্চবিদ্যালয়ের জে৵ষ্ঠ শিক্ষক সুধীর রায় প্রমুখ।
পরে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক কুইজ অনুষ্ঠিত হয়। অলিম্পিয়াডে নীলফামারী সরকারি উচ্চবিদ্যালয়, নীলফামারী সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়, ছমির উদ্দিন স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৯৬ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। তাদের মধ্য থেকে বিজয়ী পাঁচ শিক্ষার্থীকে পুরস্কৃত করা হয়। প্রথম হয়েছে জলঢাকা উপজেলার শিমুলবাড়ী ‘সিডিউল কাস্ট উচ্চবিদ্যালয়’–এর শিক্ষার্থী রিপন ইসলাম, দ্বিতীয় নীলফামারী সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের মুহিত ইসলাম, তৃতীয় নীলফামারী সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের জান্নাতি বৃষ্টি, চতুর্থ ছমির উদ্দিন স্কুল অ্যান্ড কলেজের মানষী রায় এবং পঞ্চম হয়েছে নীলফামারী সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নওশীন শারমিলি।
অনুষ্ঠানে বন্ধুসভার সহসভাপতি মীর সাদিক হোসেন, সহসাংগঠনিক সম্পাদক ফারজানা মমো, দপ্তর সম্পাদক সুমন ইসলাম, জেন্ডার ও সমতাবিষয়ক সম্পাদক জান্নাতি রম্মান, বইমেলা সম্পাদক দুলালী খাতুন, দুর্যোগ ও ত্রাণবিষয়ক সম্পাদক সোহেল রানাসহ অন্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।