মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে অন্য কোনো কিছুর তুলনা করা যাবে না

দিনাজপুর জিলা স্কুলে ‘বন্ধুসভা মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াড ২০২৬’ অনুষ্ঠানছবি: বন্ধুসভা

‘১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ কোনো সাধারণ ইতিহাস নয়, এটি বাঙালির আত্মত্যাগ, সাহস এবং আত্মমর্যাদার এক অনন্য দলিল। স্বাধীনতা অর্জনের জন্য ৩০ লাখ শহীদের জীবন উৎসর্গ করতে হয়েছে এবং প্রায় দুই লাখ মা-বোনকে চরম নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে,’ দিনাজপুরে ‘বন্ধুসভা মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াড ২০২৬’ অনুষ্ঠানে অতিথির বক্তব্যে কথাগুলো বলেন মুক্তিযোদ্ধা শফিকুল হক ছটু।

২৮ মার্চ সকালে দিনাজপুর জিলা স্কুলে এই অলিম্পিয়াডের আয়োজন করেছে দিনাজপুর বন্ধুসভা। ‘মুক্তিযুদ্ধের আলোয় জাগ্রত তারুণ্য’ স্লোগানে নতুন প্রজন্মের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, তাৎপর্য ও মূল্যবোধ ছড়িয়ে দিতে প্রথমবারের মতো দেশব্যাপী এ আয়োজন করছে প্রথম আলো বন্ধুসভা।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসভিত্তিক কুইজ প্রতিযোগিতা
ছবি: বন্ধুসভা

মুক্তিযোদ্ধা শফিকুল হক ছটু জানান, তিনি একজন সাধারণ পরিবারের সন্তান। তাঁর বাবা ছিলেন ভাষাসৈনিক, যাঁকে সেসময় একাধিকবার কারাবরণ করতে হয়েছিল। দেশপ্রেমের সেই আদর্শ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি নিজেও মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। যুদ্ধে যাওয়ার আগে স্বপ্ন ছিল একটি স্বাধীন দেশ, যেখানে থাকবে না কোনো নিপীড়ন, নির্যাতন, দুর্নীতি বা দুঃশাসন।

গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে শফিকুল হক ছটু বলেন, ‘বর্তমান বাস্তবতায় দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্নীতির ছাপ স্পষ্ট। যে দেশ ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত, সেখানে দুর্নীতির কোনো স্থান থাকতে পারে না। তাই এই অবক্ষয় রোধে সবাইকে সৎ, নিষ্ঠাবান এবং দায়িত্বশীল হতে হবে। পাশাপাশি অন্যদেরও দুর্নীতি থেকে বিরত রাখতে সচেতন ভূমিকা রাখতে হবে। বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর মধ্যে যুদ্ধের সম্ভাবনা থাকলেও বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ আর কখনো হবে না। কারণ, এই স্বাধীনতা কারও কথা বা হুমকিতে অর্জিত হয়নি; এটি এসেছে অসংখ্য মানুষের আত্মত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে। মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস জানতে হবে, সেই ইতিহাসকে হৃদয়ে ধারণ করতে হবে এবং দেশকে এগিয়ে নিতে সেই চেতনায় অনুপ্রাণিত হতে হবে।’

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসভিত্তিক কুইজ প্রতিযোগিতা
ছবি: বন্ধুসভা

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে দিনাজপুর জিলা স্কুলের শিক্ষক ও বন্ধুসভার উপদেষ্টা শাহজাহান সাজু বলেন, ‘যাঁদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা এই স্বাধীন ও সুন্দর দেশ পেয়েছি, তাঁদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা চিরকাল অটুট থাকবে। আমরা সব সময় তাঁদের স্যালুট জানাব, কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করব এবং তাঁদের আদর্শকে জীবনে ধারণ করার চেষ্টা করব। শিক্ষার্থীদের মাঝে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাই নয়, নৈতিকতা, সততা ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এই গুণাবলিই একজন শিক্ষার্থীকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে।’

শাহজাহান সাজু বলেন, ‘বর্তমান সময়ে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে নানা ধরনের বিভ্রান্তি ও অপপ্রচার ছড়ানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জাতির সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায়। এটি অনন্য এবং এর সঙ্গে কোনো কিছুর তুলনা করা যায় না। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ একবারই হয়েছে এবং এর মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখা আমাদের সবার দায়িত্ব। তাই শিক্ষার্থীদের উচিত মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানা এবং তা গভীরভাবে উপলব্ধি করা।’

দিনাজপুরে ‘বন্ধুসভা মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াড-২০২৬’–এ বিজয়ী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অতিথিরা
ছবি: বন্ধুসভা

অলিম্পিয়াডে ছিল কুইজ প্রতিযোগিতা। বহুনির্বাচনি পরীক্ষার মাধ্যমে বিজয়ীদের নির্বাচন করা হয়। অনুষ্ঠানে জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে আলোচনা সভার সূচনা হয়। সভায় অলিম্পিয়াডের বিজয়ী শিক্ষার্থীদের মাঝে পুরস্কার হিসেবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক বিভিন্ন বই উপহার দেওয়া হয়।

দিনাজপুর জেলা প্রশাসক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জাতির গৌরবময় ইতিহাস। অসংখ্য বীর মুক্তিযোদ্ধার আত্মত্যাগের মাধ্যমে আমরা অর্জন করেছি স্বাধীনতা। তাঁদের এই ত্যাগ কখনো ভোলার নয়। তোমরা যারা আজকের তরুণ প্রজন্ম, তোমরাই আগামী বাংলাদেশের নেতৃত্ব দেবে। তাই মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানা এবং তা হৃদয়ে ধারণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ধরনের অলিম্পিয়াড তোমাদের জ্ঞান বৃদ্ধি করবে এবং দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করবে।’

জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়
ছবি: বন্ধুসভা

স্থানীয় মুক্তিযুদ্ধ গবেষক বিধান দত্ত শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আজ স্বাধীনতার ৫৫ বছরে এসে অনেক ক্ষেত্রেই স্খলিত হয়েছে। সত্যিকার ইতিহাস আমরা নতুন প্রজন্মের কাছে যথাযথভাবে তুলে ধরতে পারিনি, এটা আমাদের ব্যর্থতা। তোমাদের শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ না থেকে নিজ নিজ অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানার চেষ্টা করো। দিনাজপুরের কথাই ধরো—এখানকার রাজবাড়ির সুখসাগরে একটি স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে, যেখানে মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রায় ২৫ জন নিরীহ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। এ ধরনের ঘটনা শুধু একটি স্থানে নয়, দিনাজপুরজুড়েই অসংখ্য স্থানে ছড়িয়ে আছে, যেখানে হাজার হাজার মানুষ শহীদ হয়েছেন।

অনেকেই আজ ৩০ লাখ শহীদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। কিন্তু তারা কি কখনো ভেবে দেখেছে শুধু একটি জেলার ভেতরেই এত গণহত্যার চিহ্ন রয়েছে! এ ছাড়া যাঁরা যুদ্ধের সময় ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন, তাঁদের অনেকেই আর ফিরে আসতে পারেননি। কলেরা ও অন্যান্য মহামারিতে তাঁরা মৃত্যুবরণ করেছেন। তাঁরা কি মুক্তিযুদ্ধের শিকার নন? তাঁদের মৃত্যু কি এই যুদ্ধেরই পরিণতি নয়?

দিনাজপুরে ‘বন্ধুসভা মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াড-২০২৬’–এ বিজয়ী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অতিথিরা
ছবি: বন্ধুসভা

সঠিক ইতিহাস জানতে হলে তোমাদের খুঁজে নিতে হবে জীবন্ত দলিল আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের। তাঁদের কাছ থেকে শোনো সেই সময়ের গল্প, অনুভব করো ইতিহাসের বাস্তবতা।’

নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরার যে মহৎ উদ্যোগ প্রথম আলো বন্ধুসভা নিয়েছে, তার জন্য তিনি বন্ধুসভার প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

প্রশিক্ষণ সম্পাদক, দিনাজপুর বন্ধুসভা