দিনটি জীবনের ডায়েরিতে সুন্দর একটি স্মৃতি হয়ে থাকবে। গণিতের জাদুকরি দুনিয়ায় হারিয়ে গিয়েছিলাম একঝাঁক খুদে গণিতবিদের সঙ্গে। ডাচ্–বাংলা ব্যাংক–প্রথম আলো গণিত উৎসব ২০২৬–এর কুমিল্লা আঞ্চলিক পর্বে ১৭ জানুয়ারি প্রথমবারের মতো পরীক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করলাম। একসময় নিজেও বেঞ্চে বসে পরীক্ষা দিয়েছি, আর এবার টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থীদের মেধা যাচাইয়ের সাক্ষী হলাম।
‘গণিত শেখো, স্বপ্ন দেখো’ স্লোগানে নবাব ফয়জুন্নেছা সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে জাতীয় সংগীতের সঙ্গে পতাকা উত্তোলনের পর বেলুন উড়িয়ে উৎসবের উদ্বোধন করেন কুমিল্লার জেলা প্রশাসক মু রেজা হাসান, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ আবুল বাসার ভূঁইয়া, কুমিল্লা আইডিয়াল কলেজের অধ্যক্ষ মহিউদ্দিন লিটন, কুমিল্লা জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. আবদুল হাফিজ, প্রথম আলো কুমিল্লার প্রতিনিধি আবদুর রহমানসহ অন্য অতিথিরা।
বিদ্যালয় মাঠ যখন মুখর ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী ও কুমিল্লা জেলার শত শত শিক্ষার্থীর অভিভাবকের পদচারণে, তখন হলের ভেতরটা ছিল একদম শান্ত। একেকটি শিশুর গাণিতিক প্রতিভা আর সমস্যার সমাধান করার ধরন দেখে অবাক হচ্ছিলাম। দায়িত্ব পালনের সময় এক অন্য রকম অনুভূতির মুখোমুখি হলাম। হলের ভেতর যখন পিনপতন নীরবতা, তখন চারদিকে তাকাতেই দেখলাম এক অভাবনীয় দৃশ্য। ছোট ছোট শিশুর কপালে চিন্তার ভাঁজ, কলম কামড়ে ধরে অঙ্কের জট খোলার চেষ্টা আর মাঝেমধ্যে শূন্যে তাকিয়ে থাকা সেই নিষ্পাপ চাহনি—সব মিলিয়ে এক দারুণ অভিজ্ঞতার জন্ম দিল।
সবচেয়ে ভালো লাগছিল তাদের চিন্তার ছাপ দেখে। একটা কঠিন গাণিতিক সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে তাদের মুখাবয়ব যেভাবে বারবার পাল্টাচ্ছিল, তা সত্যিই মুগ্ধ করার মতো। কারও চোখেমুখে গভীর ধ্যানের ছাপ, কেউবা ছোট একটা সূত্র মনে পড়ার আনন্দে হঠাৎ মুচকি হাসছে। সেই এক ঘণ্টার লড়াই কেবল খাতা-কলমের ছিল না, ছিল তাদের মেধা আর বুদ্ধির লড়াই।
পরীক্ষক হিসেবে যখন পাশ দিয়ে হাঁটছিলাম, দেখছিলাম একেকজনের মনোযোগ কতটা প্রখর! চারপাশের জগৎ ভুলে মগ্ন হয়ে আছে জ্যামিতিক নকশা আর বীজগণিতের গোলকধাঁধায়। এই চাপের মধ্যেও হাল না ছাড়ার মানসিকতা দেখে ছোটবেলার কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। বড়দের দুনিয়ায় আমরা যে চাপের কথা বলি, তার চেয়ে অনেক বেশি পবিত্র আর সুন্দর এই জ্ঞানের চাপ।
বুঝতে পারলাম, গণিত শুধু ভয় পাওয়ার বিষয় নয়, গণিত মানে গভীর আনন্দের নাম। এই বাচ্চাদের চোখের গভীরতা আর মেধার স্ফুরণ দেখে নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অসম্ভব প্রতিভাবান। আগামীর বাংলাদেশ তাদের হাতেই নিরাপদ।
ডাচ্–বাংলা ব্যাংক–প্রথম আলো গণিত উৎসব ২০২৬–এর কুমিল্লা আঞ্চলিক পর্বে সার্বিক সহযোগিতা করেছেন কুমিল্লা বন্ধুসভার বন্ধুরা।
পাঠাগার ও পাঠচক্র সম্পাদক, কুমিল্লা বন্ধুসভা