বন্ধুসভা মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াড ২০২৬
‘একাত্তর আর মুক্তিযুদ্ধ আমাদের শিকড়, ভুলে গেলে চলবে না’
‘১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ শুধুই মুক্তিযুদ্ধ নয়, এটি বাঙালি জাতি, স্বাধীন ও লাল–সবুজ বাংলাদেশের অস্তিত্ব। শির উঁচু করে দাঁড়ানোর এক ঐতিহাসিক দলিল। একাত্তর আর মুক্তিযুদ্ধ আমাদের শিকড়, ভুলে গেলে চলবে না। এই দেশ এমনি এমনি স্বাধীন হয়নি। ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে এবং মা–বোনদের আত্মত্যাগে স্বাধীন হয়েছে এই দেশ। মাটির গন্ধে, রক্তের দাগে আর অদম্য সাহসে লেখা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হৃদয়ে ধারণ করে, সেই আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বাংলাদেশকে এগিয়ে যেতে হবে।’
আজ রোববার দুপুর পৌনে ১২টায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের কলেজপাড়ায় অবস্থিত আইডিয়াল রেসিডেনসিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে ‘বন্ধুসভা মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াড–২০২৬’ অনুষ্ঠানে বীর মুক্তিযোদ্ধারা এ কথা বলেন। এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বন্ধুসভা। ‘মুক্তিযুদ্ধের আলোয় জাগ্রত তারুণ্য’ স্লোগানে নতুন প্রজন্মের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, তাৎপর্য ও মূল্যবোধ ছড়িয়ে দিতে মার্চজুড়ে দেশব্যাপী মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াডের আয়োজন করছে প্রথম আলো বন্ধুসভা।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া বন্ধুসভার সভাপতি শাহজাহান মিয়ার সভাপতিত্বে ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আলেয়া মাহবুবের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, শিক্ষক ও মুক্তিযোদ্ধারা। স্বাগত বক্তব্য দেন প্রথম আলো ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নিজস্ব প্রতিবেদক শাহাদৎ হোসেন।
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণা করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ার টানমান্দাইল গ্রামের বাসিন্দা ও মুক্তিযুদ্ধের সময়ের সর্বকনিষ্ঠ কিশোর বীর মুক্তিযোদ্ধা বীর প্রতীক আবু সালেক। বর্তমানে তিনি ষাটোর্ধ্ব, বয়স ৬৬ বছর। আবু সালেক বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ শুধু মুক্তিযুদ্ধ নয়। দেশকে স্বাধীন করার জন্য জীবন বাজি রেখে মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করেছেন। এই দেশ এমনি এমনি স্বাধীন হয়নি। অনেক ত্যাগ–তিতিক্ষা, ৩০ লাখ শহীদের বুকের তাজা রক্ত এবং দুই লাখ মা–বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতা আর এই লাল–সবুজের পতাকা। কিন্তু যখন দেখি মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে কেউ অনীহা ও বিরূপভাব প্রকাশ করে, তখন হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়। মুক্তিযোদ্ধারা মন–প্রাণ দিয়ে যুদ্ধ করেছেন বলেই পৃথিবীর মানচিত্রে লাল–সবুজের পতাকা উড়েছে। মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধকে কোনোভাবেই অবহেলা ও অসম্মান করা যাবে না। তাঁদের সম্মান করতে হবে।’
মুক্তিযোদ্ধা আবু সালেক বলেন, ‘১৯৭১ সালে আমি সপ্তম শ্রেণির ছাত্র ছিলাম। শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণার ভাষণের কথা স্কুলে শুনে উজ্জীবিত হয়েছিলাম। স্বাধীনতার ঘোষণার কথা শুনে উজ্জীবিত হয়ে স্কুল প্রাঙ্গণ ছেড়ে বাড়ি আসি। বয়স যখন ১২ বছর ১ মাস, তখন বাবা–মাকে কিছু না বলেই রাতে কিছু সেদ্ধ করা ধান সংগ্রহ করে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে ভারত যাই। এতই ছোট ছিলাম যে প্রশিক্ষণের জন্য আমাকে নির্বাচন করতে কেউ রাজি ছিল না। আমার অনেক সাহস আছে এবং যুদ্ধ করতে পারব বলে অনুরোধের পর আমাকে প্রশিক্ষণের জন্য নির্বাচিত করা হয়। পরে কসবার সীমান্তবর্তী গঙ্গাসাগর, মনিয়ন্দসহ বিভিন্ন এলাকায় যুদ্ধ করি। প্রতিটি যুদ্ধে জয়ী হয়েছি। মুক্তিযুদ্ধের গল্প স্বল্প সময়ে বলে শেষ করা যাবে না।’
আবু সালেক আরও বলেন, ‘আমাদের চিন্তাচেতনার বিকাশ ও মূল্যবোধের ভিত্তি গড়ে উঠেছে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। এই যুদ্ধ শুধু একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতা এনে দেয়নি; বরং আমাদের আত্মপরিচয়, সাহস ও জাতিসত্তার দৃঢ় ভিত্তি নির্মাণ করেছে।’
৩ নম্বর সেক্টরের সেকশন কমান্ডার ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. শাহ জামাল। তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ আমাদের হাজার বছরের ইতিহাসের এক অনন্য গৌরবগাথা। মুক্তিযুদ্ধের অনেক ইতিহাস আছে। কত রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, পরিশ্রম, নির্যাতন ও অত্যাচারের শিকার হয়ে দেশকে স্বাধীন করতে হয়েছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস যেন জাতি ভুলতে বসেছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও চেতনাকে হৃদয়ে ধারণ করে, দেশপ্রেম ও মানবিক মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে নতুন প্রজন্মকে দেশ গড়ায় এগিয়ে আসতে হবে।’
আইডিয়াল রেসিডেনসিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অ্যাডহক কমিটির সাবেক সভাপতি ও পরিচালক হারুন অর রশিদ বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ মানে, মুক্তির জন্য যুদ্ধ। হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করে আমাদের বাংলাদেশ উপহার দিয়েছেন। পৃথিবীর ইতিহাসে আমরাই একমাত্র জাতি, যারা মায়ের ভাষার জন্য যুদ্ধ করেছি। আমাদের পরিচয়, দেশের পতাকা যাঁরা এনে দিয়েছেন, তাঁরা মুক্তিযোদ্ধা। এই প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় কাজ করতে হবে, দেশকে ভালোবাসতে হবে।’
আরেক পরিচালক শাহীন মৃধা বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধারা প্রাণের রক্ত দিয়ে দেশকে স্বাধীন করেছেন। ১৯৭১ ও মুক্তিযুদ্ধ আমাদের শিকড়, ভুলে গেলে চলবে না। মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান করতে হবে। পরিচয়ে আমরা বাঙালি—১৯৭১, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২৬ মার্চ ও ১৬ ডিসেম্বর আমাদের অস্তিত্ব।’
আইডিয়াল রেসিডেনসিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রীনা বালা মল্লিক বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ আমাদের শিখিয়েছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে, অধিকার আদায়ে ঐক্যবদ্ধ হতে এবং মানবিক মূল্যবোধকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে। তাই এই চেতনাকে ধারণ করে তরুণ প্রজন্মকে একটি বৈষম্যহীন, উন্নত ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার করতে হবে।’
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া বন্ধুসভার সাবেক সভাপতি অভিজিৎ রায়। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসভিত্তিক কুইজ প্রতিযোগিতায় মোট ১৮১ শিক্ষার্থী অংশ নেয়। প্রাথমিক বাছাই শেষে পাঁচ শিক্ষার্থীকে বিজয়ী হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। প্রথম হয়েছে বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী শেখ মোহাম্মদ দাইয়ান, দ্বিতীয় একই প্রতিষ্ঠানের আবরার খালেদ, তৃতীয় আসিফ টিউটোরিয়াল অ্যান্ড হাইস্কুলের রামিয ওয়াসীত খান, চতুর্থ নিয়াজ মুহম্মদ উচ্চবিদ্যালয়ের আফসানা রহমান এবং পঞ্চম হয়েছে আইডিয়াল রেসিডেনসিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী কামরুন্নাহার রিতু।
পরে বিজয়ী শিক্ষার্থীদের হাতে মুক্তিযুদ্ধের গল্পের বই উপহার দেওয়া হয়। এর আগে জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের শুরু হয়। জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন আইডিয়াল রেসিডেনসিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রীনা বালা মল্লিক। আয়োজনের সহযোগিতায় ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া বন্ধুসভার সদস্যরা।