পাঠকের রুচি কীভাবে গড়ে উঠছে, এই প্রশ্ন নিয়ে ভাবা জরুরি

গোবিপ্রবি বন্ধুসভার পাঠচক্রের আসরছবি: বন্ধুসভা

বাংলা সাহিত্যে পাঠকের রুচির পরিবর্তন, জনপ্রিয়তার পেছনে ছুটতে গিয়ে সাহিত্য মানের অবমূল্যায়ন ও সমকালীন কিছু বহুল পঠিত গ্রন্থের বিষয়বস্তু নিয়ে ‘সমসাময়িক পাঠ’ শিরোনামে পাঠচক্র করেছে গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (গোবিপ্রবি) বন্ধুসভা।

সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠিত পাঠচক্রে আলোচনার কেন্দ্রে ছিল বর্তমান প্রজন্ম কী পড়ছে, কেন পড়ছে এবং পাঠের মাধ্যমে তার চিন্তা ও রুচি কতটা সমৃদ্ধ হচ্ছে। আলোচনায় বিশেষভাবে উঠে আসে ইলমা বেহরোজের আলোচিত উপন্যাস ‘পদ্মজা’। বইটি সমকালীন উপন্যাস হিসেবে ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করেছে। রকমারিতে বইটির শত শত রেটিং ও রিভিউ রয়েছে।

পাঠচক্রে বক্তারা বলেন, কোনো বই জনপ্রিয় হলেই সেটিকে উৎকৃষ্ট সাহিত্য হিসেবে গ্রহণ করা যেমন যুক্তিসংগত নয়, তেমনি পাঠকের পছন্দকে এক কথায় ‘রুচিহীনতা’ বলেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না; বরং পাঠকের রুচি কীভাবে গড়ে উঠছে এবং বাজার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও প্রকাশনা–সংস্কৃতি সেই রুচিকে কীভাবে প্রভাবিত করছে—এ প্রশ্নগুলো নিয়ে গভীরভাবে ভাবা জরুরি।

আলোচনায় সমকালীন জনপ্রিয় রোমান্টিক ও অনলাইননির্ভর কথাসাহিত্যের পাশাপাশি বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থগুলোর প্রসঙ্গও আসে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’, আহমদ ছফার ‘গাভী বিত্তান্ত’, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গোরা’ ও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘শ্রীকান্ত’–এর মতো গ্রন্থের সঙ্গে বর্তমানের জনপ্রিয় পাঠধারার তুলনা করে আলোচকেরা সাহিত্য পাঠের গভীরতা, ভাষা, জীবনবোধ ও সামাজিক বাস্তবতার গুরুত্ব তুলে ধরেন।

বক্তারা বলেন, ‘পদ্মা নদীর মাঝি’র মতো উপন্যাসে প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রাম, সম্পর্ক ও সামাজিক বাস্তবতার যে গভীর শিল্পরূপ পাওয়া যায়, তা পাঠককে শুধু বিনোদন দেয় না, জীবন ও সমাজকে নতুনভাবে দেখতে শেখায়। বন্ধুসভার অন্য একটি পাঠচক্রেও ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ নিয়ে আলোচনায় উপন্যাসটির চরিত্র চিত্রণ ও জীবন ঘনিষ্ঠতার বিশেষ দিক তুলে ধরা হয়েছিল।

গোবিপ্রবি বন্ধুসভার পাঠচক্রের আসর।

বক্তারা আরও বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া, দ্রুতপাঠ্য প্রেমকাহিনি কিংবা অতিরিক্ত আবেগনির্ভর আখ্যানের জনপ্রিয়তাকে একেবারে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে পাঠের জগৎ যদি কেবল বিনোদন, চমক ও রোমান্টিক কল্পনার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, তাহলে পাঠকের চিন্তার পরিসর সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

পাঠচক্রে ‘রুচির দুর্ভিক্ষ’ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করে বক্তারা মূলত এমন এক পাঠ–সংস্কৃতির সমালোচনা করেন, যেখানে বইয়ের সাহিত্যিক মূল্য, ভাষার সৌন্দর্য, জীবনবোধ ও চিন্তার গভীরতার চেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয়তা, প্রচারণা ও তাৎক্ষণিক আবেগ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে পাঠকের রুচি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে কোনো নির্দিষ্ট লেখক বা পাঠকগোষ্ঠীকে হেয় করা উচিত নয়; বরং পাঠককে বৈচিত্র্যময় ও মানসম্মত সাহিত্য পাঠের সুযোগ করে দেওয়া এবং ভালো বই নিয়ে যুক্তিনির্ভর আলোচনা তৈরি করাই হতে পারে রুচির বিকাশের কার্যকর পথ।

পাঠচক্রে গোবিপ্রবি বন্ধুসভার বন্ধুরা অংশ নেন। এ ছাড়া গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় সাহিত্য সংসদের প্রতিনিধিরা আলোচনা করেন। তাঁরা সমকালীন বাংলা সাহিত্য পাঠের প্রবণতা নিয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন এবং নিয়মিত পাঠচক্রের মাধ্যমে মানসম্মত বই পাঠ ও সাহিত্যবিষয়ক মুক্ত আলোচনা আরও জোরদার করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

সাধারণ সম্পাদক, গোবিপ্রবি বন্ধুসভা