ডাকবাক্সের কথাকুঞ্জ

বিশ্ব ডাক দিবসের অনুষ্ঠান ‘ডাকবাক্সের কথাকুঞ্জ’
ছবি: বেলালুর রহমান

প্রিয়জনের জন্য মনের ভাব কাগজে লিখেছেন কখনো? কখনো কি কারও লেখা চিঠির প্রত্যুত্তর করেছেন? দিনের পর দিন, মাসের পর মাস প্রিয় মানুষের গন্ধ মাখা, গোটা গোটা অক্ষরে লেখা চিঠির জন্য কেউ অপেক্ষার প্রহর গুনেছেন?

বর্তমান যুগ তথ্যপ্রযুক্তির, ইন্টারনেটের কল্যাণে আমরা অনেক দূর এগিয়ে এসেছি। চিঠির যুগ ফেলে ইলেকট্রনিক বার্তার যুগে এখন। মুহূর্তের ব্যবধানে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে টুংটাং আওয়াজ তুলে খুদে বার্তা পৌঁছে যায়। তবে সে বার্তায় থাকে না হাতে লেখা চিঠির মতো ভুল বানানের কাটাকুটি কিংবা শব্দের ওপর হাত বুলিয়ে চিঠিদাতাকে স্পর্শ করার অনুভূতি। প্রযুক্তির কল্যাণে আজ আমরা ভুলতে বসেছি, চিঠি শুধুই একটি যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং এটি একটি শিল্প। সুন্দর হাতের লেখা, কারুকার্য, লেখনশৈলীতে পরিপূর্ণ একটি চিঠির গুরুত্ব হাজারটি ইলেকট্রনিক খুদে বার্তার থেকেও দামী। বর্তমান সময়ে এটি বিলুপ্তপ্রায় অনুভূতি। বিয়ের লাল বেনারসির মতো টুকটুকে ডাকবাক্সটা আজ বিধবার থানের মতো মলিন হয়ে পড়ে রয়েছে। কালের বিবর্তনে মরিচায় ক্ষয়ে যাওয়া ডাকবাক্সে তামাটে রং ধরেছে, মরিচা ধরেছে আমাদের মনন এবং সৃষ্টিশীলতায়।

অনুষ্ঠান শেষে দিনাজপুর বন্ধুসভার বন্ধুরা
ছবি: বেলালুর রহমান

সৃষ্টিশীলতা ও মননশীলতার বিকাশে এবার ‘ডাকবাক্সের কথাকুঞ্জ’ শিরোনামে দিনাজপুর বন্ধুসভা উদ্‌যাপন করে বিশ্ব ডাক দিবস ২০২৩। ৯ অক্টোবর বিকেলে প্রথম আলোর দিনাজপুর অফিসে অর্ধশত বন্ধুর উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হয় এই আয়োজন।

স্বাগত বক্তব্যে প্রথম আলোর প্রতিনিধি শৈশব রাজু বলেন, ‘চিঠির ভাষা যুগের পরিবর্তনে পরিবর্তিত হচ্ছে। আমরা এ ভাষাকে বাঁচাতে চাই। আসুন সবাই চিঠি লিখি, প্রিয়জন, বন্ধু, মা–বাবা, শিক্ষক—যাঁকেই পারি, এই চর্চাটা আমাদেরকে আরও সমৃদ্ধ করবে।’ বক্তব্য শেষে কাছের বন্ধুদের নিয়ে লেখা অসাধারণ একটি চিঠি পাঠ করেন তিনি এবং উপস্থিত সকলকে প্রতি মাসে অন্তত একটি করে চিঠি লেখার শপথ গ্রহণ করান।

আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ডাক বিভাগের সুপারিনটেনডেন্ট রশিদুর রহমান। কথাকুঞ্জের আলাপচারিতায় উঠে আসে পোস্ট অফিসগুলোর বর্তমান অবস্থা। জানা যায়, বর্তমানে ব্যক্তিগত চিঠি পাঠাতে খরচ হয় চিঠিপ্রতি ৫ টাকা, রেজিস্ট্রি চিঠির জন্য খরচ হয় ৮ টাকা এবং জিপিওর জন্য চিঠিপ্রতি খরচ ১০ টাকা। এ ছাড়াও তিনি বলেন, ‘বর্তমান সময়ে ব্যক্তিগত চিঠির পরিমাণ অনেক কমে গেছে। তথ্যপ্রযুক্তির যুগে সবাই মোবাইল মেসেজে অভ্যস্ত। কিন্তু চিঠির মাধ্যমে আমরা আমাদের আবেগ যতটা সুন্দরভাবে প্রকাশ করতে পারি, একটা ক্ষুদে বার্তা কখনোই সেই মনের ভাব সম্পূর্ণ প্রকাশ করতে পারে না। আমি এখনো চিঠি লিখি। ভাষা শেখার অন্যতম মাধ্যম চিঠি লেখা। বানানশৈলী, ব্যকরণ, সাধু ভাষা, চলিত ভাষা দারুনভাবে শেখা যায় চিঠি লিখলে। এ ছাড়াও শব্দ চয়ন ও হাতের লেখাতেও আসে সৌন্দর্য। সবার প্রতি অনুরোধ থাকবে, আপনারা চিঠি লিখবেন, অন্যদেরকেও উৎসাহিত করবেন।’

চিঠি পাঠ করছেন এক বন্ধু
ছবি: বেলালুর রহমান

দিনাজপুর ডাক বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত ডাকপিয়ন আরশাদ আলী বলেন, ‘১৯৮৫ সালে চাকরিতে যোগদান করি। তখন ডাকপিয়নেরা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চিঠি পৌঁছে দিত। রাতের অন্ধকারে হারিকেন দিয়ে সাইকেলে করে পথ চিনে কত চিঠি পরিবহন করেছি নিজেও। শুধু চিঠিই না, মানি অর্ডারও দায়িত্ব নিয়ে পৌঁছে দিতাম প্রাপকের কাছে। আজকাল এসব দেখা যায় না। এখন ঘরে ঘরে মোবাইল, যুগ পাল্টে গেছে।’

অনুভূতি প্রকাশ করে বন্ধু ফারহানা রহমান বলেন, ‘ডাকবক্সের কথাকুঞ্জে এসে অনিন্দ্য সুন্দর একটা বিকেলের সাক্ষী হতে পেরে বেশ ভালো লাগছে। আমাদের ডাকবাক্সগুলো প্রাণ ফিরে পাক। চিঠি লেখা চর্চার মাধ্যমে কেটে যাক অনলাইন আসক্তি। বাড়তে থাকুক চমৎকার শব্দের ভান্ডার। এক সেকেন্ডের ম্যাসেজের রিপ্লাই নয়, বরং চিঠি লেখা এবং চিঠির প্রত্যুত্তর পাওয়ার মাধ্যমে ফিরে আসুক আমাদের দীর্ঘ সময় প্রতিক্ষা করার মতো ধৈর্য্যশক্তি।’

আলোচনা পর্ব শেষে গত ১ সেপ্টেম্বর চিঠি দিবস উপলক্ষে আয়োজিত ‘চিঠিপত্র সপ্তাহ’ প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করা হয়। বিজয়ীরা হলেন সাদিয়া আফরোজ, শবনম মুস্তারিন, নাজমুন নাহার, জান্নাতুন বুশরা ও সুজিত কুমার পাল।

পুরস্কার হাতে ‘চিঠিপত্র সপ্তাহ’ প্রতিযোগিতার বিজয়ীরা
ছবি: বেলালুর রহমান

চিঠি লেখার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে বন্ধুদের হাতে তৈরি দিনাজপুর বন্ধুসভার ডাকবাক্সের শুভ উদ্বোধন করা হয়। যেখানে বন্ধুরা চর্চায় রাখবে তাঁদের লেখালেখি। জমিয়ে রাখবে আবেগ ও অনুভূতির গল্প। সমাপনী বক্তব্যে দিনাজপুর বন্ধুসভার উপদেষ্টা রেজাউল করিম রঞ্জু বলেন, ‘চিঠি পেতে সবারই দারুণ লাগে। আমিও অনেক চিঠি পেয়েছি। বর্তমানে এই অভ্যেসগুলো কমে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্য আমরা এই অভ্যেস হারিয়ে ফেলেছি। এগুলো চর্চায় রাখতে হবে। সেই লক্ষ্যেই আজকের আয়োজন। যে শপথ আমরা গ্রহণ করেছি, তা পূর্ণ হলেই আয়োজন সফল।’

প্রিয়জনের চিঠি পাওয়ার আকুতি নিয়ে আয়োজন শেষে কবিতা আবৃত্তি করেন বন্ধু শবনম মুস্তারিন। সঞ্চালনায় ছিলেন সাধারণ সম্পাদক শুভ রায়। আয়োজনে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রথম আলোর আঞ্চলিক কর্মকর্তা ইমরান আলী, স্থানীয় সাংবাদিক আবদুস সাত্তার, বন্ধুসভার সহসভাপতি সাব্বির হাসান, সুব্রত সরকার, সাংগঠনিক সম্পাদক সুদর্শন চন্দ্র অধিকারী, অর্থ সম্পাদক সাদিয়া আফরোজ, দপ্তর সম্পাদক বেলালুর রহমান, দুর্যোগ ও ত্রাণ সম্পাদক খেয়া রানী রায়, বন্ধু দিপু রায়, শুভজিৎ রায়, মনোরঞ্জন সিংঘ, বিথী জামান, সিরাজম মুনিরা, বিপ্লব রায়, সুশান্ত রায়, কবীর, রবিউল, কৃষ্ণ বর্মন প্রমুখ।

সহসভাপতি, দিনাজপুর বন্ধুসভা