গতকাল মঙ্গলবার ভোরের সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই ব্রহ্মপুত্র নদের শীতল হাওয়ায় অন্য রকম এক উৎসবের রং লাগে জামালপুর শহরের ফৌজদারী বালু মাঠে। রংবেরঙের পাঞ্জাবি আর শাড়িতে সেজে বন্ধুসভার বন্ধুরা আনন্দে মেতে ওঠেন সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সঙ্গে। পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে এদিন জামালপুর বন্ধুসভার উদ্যোগে শিশুদের নিয়ে অনুষ্ঠিত হয় ‘পান্তা-ইলিশ উৎসব’।
উৎসবের প্রস্তুতি শুরু হয় আগের দিন, অর্থাৎ ১৩ এপ্রিল চৈত্রসংক্রান্তিতে। সেদিন বন্ধুসভার বন্ধুরা মিলে শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিশুদের তথ্য সংগ্রহ করেন। এরপর বাজার করা, ব্যানার তৈরি ও ভেন্যু সাজানোর মতো আনুষঙ্গিক সব কাজ সম্পন্ন করা হয়। ১৪ এপ্রিল ভোরে ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে যখন আয়োজন শুরু হয়, তখন শিশুদের কলকাকলিতে মুখর হয়ে ওঠে বালুচর।
খাওয়ার আগে শিশুদের বিনোদনের জন্য আয়োজন করা হয় দৌড় প্রতিযোগিতা। বালুর চরে ছোট শিশুদের দৌড় আর আনন্দ-উল্লাস উপস্থিত সবার নজর কাড়ে। প্রতিযোগিতা শেষে শিশুদের মধ্যে চকলেট বিতরণ করা হয়। এরপর শুরু হয় বন্ধুদের সঙ্গে শিশুদের গান আর গল্পের আড্ডা।
মূল আকর্ষণ ছিল পান্তাভাত ও ভাজা ইলিশ। সঙ্গে ছিল আলুর ভর্তা, শুঁটকিভর্তাসহ হরেক পদের দেশি ঐতিহ্যবাহী ভর্তা। মানবিকতার হাত বাড়িয়ে বন্ধুরা আশপাশের কিছু মানসিক ভারসাম্যহীন ও শ্রমজীবী মানুষকেও এ উৎসবে আপ্যায়ন করান। সবাই একসঙ্গে বসে ঐতিহ্যবাহী এ খাবারে অংশ নেন।
সম্রাট নামে ১২ বছর বয়সী এক শিশু অনুভূতি প্রকাশ করে বলে, ‘আইজকা ম্যালা দিন পরে মনডা ভইরা খাইলাম। ভাইরা আমগরে লগে যে গান গাইল, খুব ভালো লাগল।’
আট বছর বয়সী বিষ্ণু রানী বলে, ‘আমি তো আগে খালি ইলিশ মাছের নামই হুনছি (শুনছি), কুনুদিন চোহে দেহি নাই। আইজকাই পয়লাবার (প্রথমবার) খাইলাম, কী যে মজা!’
৫২ বছর বয়সী শ্রমজীবী রহিম মিয়া বলেন, ‘কামাই-রোজগার নাই, সকালে খালি পেটে কামে বাইর হইছি। বন্ধুসভার পোলাপাইনগর লাইগা আইজকা পেট ভইরা খাইলাম। আল্লাহ হেরগরে ভালো করুক, গরিবের কতা মনে রাখন কি কম কথা!’
জামালপুর বন্ধুসভার সভাপতি অন্তরা চৌধুরী বলেন, ‘১২ এপ্রিল ছিল বিশ্ব পথশিশু দিবস। ইউনিসেফের তথ্যমতে, অধিকাংশ পথশিশু নানা বঞ্চনার শিকার হয়। সেই দায়বদ্ধতা থেকেই আমাদের এ আয়োজন। কৃতজ্ঞতা জানাই আমাদের সব বন্ধুর প্রতি, যাঁরা চৈত্রসংক্রান্তি থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত অক্লান্ত পরিশ্রম করে এ আয়োজন সফল করেছেন।’
সার্বিক সহযোগিতার জন্য বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানান জামালপুর বন্ধুসভার উপদেষ্টা সিফাত আব্দুল্লাহ্, সাবেক সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন, সহসাংগঠনিক সম্পাদক বাকি বিল্লাহ, দপ্তর সম্পাদক নাহিদুল হাসান এবং মুক্তিযুদ্ধ ও গবেষণা সম্পাদক মো. হৃদয়কে।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সাধারণ সম্পাদক কামরুল ইসলাম খান, সাংগঠনিক সম্পাদক রাসেল মিয়া, অর্থ সম্পাদক সাদিয়া সিদ্দিকা, পাঠাগার ও পাঠচক্র সম্পাদক নুসরাত শৈলী, সাংস্কৃতিক সম্পাদক প্রত্যাশা পাল, স্বাস্থ্য ও ক্রীড়া সম্পাদক জোবাইর আহমদ, ম্যাগাজিন সম্পাদক সিয়াম আহমেদ, কার্যনির্বাহী সদস্য শামীম মিয়া, বন্ধু মাসুদ, রতনসহ অনেকে।
সভাপতি, জামালপুর বন্ধুসভা