বন্ধুসভা মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াড ২০২৬
মুক্তিযোদ্ধারা কিছু পাওয়ার আশা না করে দেশের জন্য যুদ্ধ করেছেন
‘বাংলাদেশ অনেক মানুষের ত্যাগ, জীবনদানের ফসল। নিজের দেশকে ভালোবাসতে হবে, দেশের মানুষ-প্রকৃতিকে ভালোবাসতে হবে। নিজেদেরকে মানবিক মানুষ হিসেবে তৈরি করতে হবে।’
মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে ‘বন্ধুসভা মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াড ২০২৬’ অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানার ওপর জোর দিয়ে এ কথা বলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও আলোচকেরা। ২৯ মার্চ বেলা ১১টায় এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে মৌলভীবাজার বন্ধুসভা।
এর আগে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক ৩০টি বহুনির্বাচনী প্রশ্ন নিয়ে একটি কুইজ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। ২০ মিনিটের এ পরীক্ষায় বিভিন্ন শ্রেণির প্রায় ৮০ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে। কুইজ প্রতিযোগিতা আয়োজনে সহযোগিতা করেন বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা।
কুইজের ফলাফল ঘোষণার আগে মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট ও মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ মৌলভীবাজার জেলা ইউনিট কমান্ডের আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা জামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমরা পাকিস্তানের নাগরিক ছিলাম। তখন দেশ দুই ভাগে ছিল। তারপরও আমরা বিভিন্ন ধর্মের মানুষ একসঙ্গে ছিলাম। তেমন সমস্যা ছিল না। সমস্যা সৃষ্টি করল পশ্চিম পাকিস্তান। এরপর আমাদের জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করতে হয়েছে।’
জামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমরা চাই তোমরা মানবিক মানুষ হবে। তোমরা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পড়বে। মুক্তিযোদ্ধাদের লেখা বই পড়বে। লাইব্রেরিতে মুক্তিযুদ্ধের অনেক বই আছে। যখন সময় পাবে, পাঠ্যবইয়ের বাইরে মুক্তিযুদ্ধের বই পড়বে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানবে। ইতিহাস জানা খুব দরকার। ইতিহাস থেকে মানুষ শিক্ষা নিয়ে থাকে।’
মুক্তিযোদ্ধা জামাল উদ্দিন আহমেদ আরও বলেন, ‘আমরা এখনো মুক্তিযুদ্ধের কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পাইনি। তোমরা ঠিকমতো পড়াশোনা করবে। জ্ঞান অর্জন করবে। সমাজে অবদান রাখবে। মনে রাখবে, মুক্তিযোদ্ধারা কোনো কিছু পাওয়ার আশা করে যুদ্ধ করেননি। মুক্তিযোদ্ধারা দেশের জন্য যুদ্ধ করেছেন। এখনো আমরা আমাদের সাধ্যমতো মানুষের জন্য কাজ করছি।’
মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তুলসি রানি সরকার বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ না হলে বাংলাদেশ নামের এ দেশ আমরা পেতাম না। আমরা পরাধীন থাকতাম। আমাদের পূর্বপুরুষেরা নিজের বাড়িতে থেকেও পরাধীন ছিলেন। বাঙালিরা চাকরিবাকরিতে সুযোগ-সুবিধা পেত না। দেশীয় সংস্কৃতিচর্চা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনৈতিক সুযোগ থেকে এ দেশের মানুষ বঞ্চিত হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়েই দেশ স্বাধীন হয়েছে। আজকে তোমাদের দেশ, দেশের মানুষ, দেশের সংস্কৃতি, দেশের সঠিক ইতিহাসকে জানতে হবে। দেশকে ভালোবাসতে হবে।’
কবি ও শিক্ষক কন্দর্প বিজয় চৌধুরী বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ আমাদের অত্যন্ত গৌরবের একটি বিষয়। লাখো শহীদের জীবনের বিনিময়ে আমরা স্বাধীন দেশ পেয়েছি। স্বাধীনভাবে বাস করার অধিকার পেয়েছি। মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বেশি করে পড়তে হবে। তবেই দেশকে ভালো করে জানতে পারবে।’
শিক্ষক মুহিবুর রহমান বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধারা এই দেশটি আমাদের দিয়ে গেছেন। এখন দেশটাকে তোমাদের গড়তে হবে। এ জন্য আগে নিজেদের গড়তে হবে। পড়তে হবে। বেশি করে পড়তে হবে।’
আলোচনা পর্বের সভাপতি বন্ধুসভার উপদেষ্টা, লেখক ও অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আব্দুল খালিক বলেন, ‘কী লক্ষ্য, কী উদ্দেশ্য নিয়ে দেশটা স্বাধীন করেছি। তার জন্য প্রকৃত ইতিহাস জানতে হবে। আমাদের পূর্বপুরুষেরা ভাষা আন্দোলন থেকে দেশের জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন। যার ফলে স্বাধীনতার মধ্য দিয়ে একটি ভূখণ্ড, একটি পতাকা আমরা পেয়েছি। দেশ পেয়েছি।’
স্বাগত বক্তব্য ও সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক আকমল হোসেন। পরে কুইজ প্রতিযোগিতার ফলাফল ঘোষণা করা হয়। প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছে মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির মাহদি হাসান, দ্বিতীয় হয়েছে নবম শ্রেণির তাসলিমুল সিফাত, তৃতীয় হয়েছে দশম শ্রেণির সুপ্রতীম দত্ত, চতুর্থ হয়েছে নবম শ্রেণির নীলকান্ত চক্রবর্তী এবং পঞ্চম হয়েছে অষ্টম শ্রেণির ইসরাক মুকিত। বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার হিসেবে বই তুলে দেন অতিথিরা।
অনুষ্ঠানে মৌলভীবাজার বন্ধুসভার সভাপতি রাতুল আহমদ, সাধারণ সম্পাদক তালহা আমীন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাওয়াদ কোরেশী, স্বাস্থ্য ও ক্রীড়া সম্পাদক তাসফিক কোরেশী, সাংস্কৃতিক সম্পাদক রিমা আক্তার, প্রচার সম্পাদক ইফতেখার ইফতিসহ অন্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।