নোয়াখালী বন্ধুসভার পাঠচক্রে হুমায়ূন আহমেদের ‘অপেক্ষা’

নোয়াখালী বন্ধুসভার পাঠচক্রের আসরছবি: বন্ধুসভা

সংবাদমাধ্যমে আমরা প্রতিদিনই অসংখ্য নিখোঁজ সংবাদ দেখি। কেউ হয়তো নিজের হারিয়ে যাওয়া বাবার খোঁজ করছে, কেউ নিজের স্বামীর খোঁজ করছে, আবার কেউ হয়তো নিজের সন্তানের খোঁজ করছে। আমরা কখনো কি ভেবে দেখি, এই নিখোঁজ হয়ে যাওয়া মানুষগুলোর পরিবারের অবস্থা ঠিক কেমন থাকে? কতটা আতঙ্কের মধ্যে তারা দিন কাটায়? তারা কি আজীবন নিজেদের হারিয়ে যাওয়া মানুষের ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকে?

এই প্রশ্নগুলো এবং ভাবমূর্তি নিয়েই নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের লেখা জনপ্রিয় উপন্যাস ‘অপেক্ষা’–এর গল্প গড়ে উঠেছে। গত ৯ জুলাই বিকেলে নোয়াখালীর আহমাদিয়া আদর্শ উচ্চবিদ্যালয় প্রাঙ্গণে উপন্যাসটি নিয়ে পাঠের আসর করে নোয়াখালী বন্ধুসভা। সঞ্চালনা করেন সভাপতি আসিফ আহমেদ।

পরিচয় পর্বের পর শুরু হয় মূল আলোচনা। গল্পের শুরুতেই দেখা যায়, স্বামী হাসানুজ্জামান ও ছেলে ইমনকে নিয়ে সুরাইয়ার সুখের সংসার। সেই সংসারে নতুন এক অতিথি আসতে চলেছে। এই সংবাদ দেওয়ার জন্য সুরাইয়া তার স্বামীর জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল। কিন্তু সেদিন অফিস থেকে আর বাসায় ফিরে আসে না হাসানুজ্জামান। থানা, হাসপাতাল—সব জায়গায় খোঁজ চালানো হয়, কিন্তু কোথাও হাসানুজ্জামানকে পাওয়া যায় না। এভাবে দিনের পর দিন স্বামীর ফিরে আসার অপেক্ষায় আকুল হয়ে থাকে সুরাইয়া। একপর্যায়ে সংসার, সন্তান—সব থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে বাস্তব জীবন থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেয়। তবু তার স্বামীর জন্য অপেক্ষার প্রহর যেন শেষ হচ্ছে না। এভাবেই এগিয়ে চলে উপন্যাসটির পটভূমি।

কার্যনির্বাহী সদস্য সানজিদা মাধবী বলেন, ‘উপন্যাসটি প্রথম পড়েছিলাম কলেজে থাকাকালে। এবার আবার পড়ে নতুন করে হুমায়ূন আহমেদের লেখার ছন্দে, জাদুতে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করেছি। প্রতিটি চরিত্রের ধারাবাহিকতা, পটভূমি যেন সমান্তরালভাবে এগিয়ে যাচ্ছিল।’

অর্থসম্পাদক সাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘সুরাইয়ার ভাই জামিলুর রহমানের পরিবারের গল্পটাও বেশ ভালোভাবে উঠে এসেছে। পরিবারের কর্তা যখন শুধু নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে, সেই পরিবারের গতিপথ ঠিক কতটা এলোমেলো হতে পারে, তার বাস্তব প্রতিচ্ছবি এই জামিলুর রহমানের পরিবার। এই পরিবারের দুই ছেলে শোভন ও টোকন যেন অসংখ্য বিপথে চলে যাওয়া ছেলেদেরই প্রতিনিধিত্ব করে। উপন্যাসটি একবার পড়ে পাঠক কখনোই থেমে যাবে না। বারবার পড়ার মতো উপন্যাস।’

নোয়াখালী বন্ধুসভার পাঠচক্রের আসর।

উপদেষ্টা লায়লা পারভীন বলেন, ‘হুমায়ূন আহমেদ দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করছেন প্রায় ১৪ বছর হয়েছে। কিন্তু তাঁর লেখনী তাঁর সাহিত্যসাধনার ফলে পাঠকেরা এখনো বইমেলায় তাঁর লেখা নতুন বইয়ের সন্ধানে ছুটে বেড়ান। হুমায়ূন আহমেদের লেখা প্রতিটি চরিত্র, প্রতিটি দৃশ্যপট দর্শক এবং পাঠক সমানতালে আপন করে নিয়েছেন। তার অন্যতম উদাহরণ হলো বাংলাদেশ টেলিভিশনে সম্প্রচারিত “কোথাও কেউ নেই” নাটকের চরিত্র বাকের ভাইর ফাঁসি যেন না হয়, তার জন্য দর্শকদের প্রতিবাদ এবং নানাভাবে সেই দাবি তুলে ধরেছিল। হুমায়ূন আহমেদের লেখা পড়ে, নাটক দেখে, মুভি দেখে সবাই আজও যেন সমানভাবে মুগ্ধ হয়।’

সভাপতি আসিফ আহমেদ বলেন, ‘হুমায়ূন আহমেদের লেখা হিমু সিরিজ, মিসির আলিসহ অনেক উপন্যাস, গল্প আমার মতো অসংখ্য পাঠকেরই পছন্দের তালিকায় শীর্ষে। তবে “অপেক্ষা” উপন্যাসে সুরাইয়া তার স্বামীর জন্য অপেক্ষায় ব্যাকুলতা যেমন সবার মনে দাগ কেটেছে, ঠিক তেমনি সুরাইয়ার ছেলে ইমন ও মিতুর উড়োচিঠির প্রেমালাপ খুনসুটি এবং সংলাপগুলো সব পাঠকেরই মন কেড়েছে। উপন্যাসের শেষে দরজায় কড়া নাড়া এবং কার আগমন ঘটেছিল তার মাধ্যমে কাহিনির শেষ করলেও সবাই পরের দৃশ্য জানার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে নিশ্চয়ই। এ জন্যই লেখক হুমায়ূন আহমেদ সার্থক।’

পাঠচক্রে আরও উপস্থিত ছিলেন দপ্তর সম্পাদক জুনাইন কাউসার, কার্যনির্বাহী সদস্য অর্ঘ্য ভূঁইয়া, বন্ধু সাকিব হোসেন, পিয়ারুল আহমেদসহ অনেকে।

সাধারণ সম্পাদক, নোয়াখালী বন্ধুসভা