লেখক শোনালেন এক অমোঘ সত্য

দিনাজপুর বন্ধুসভার পাঠচক্রের আসরছবি: বন্ধুসভা

দিনাজপুরের আকাশটা সেদিন ছিল অদ্ভুত শান্ত। লেখক শাকিল রেজা ইফতির বাসার ড্রয়িংরুমে দিনাজপুর বন্ধুসভার বন্ধুরা। সামনে হুইলচেয়ারে বসা ভাবলেশহীন কিন্তু দীপ্ত চোখের লেখক। পাশে তাঁর সহধর্মিণী ও আজন্ম সঙ্গী মেহনাজ। আড্ডার কেন্দ্রে ছিল তাঁর প্রকাশিত বই ‘আমার ইস্তাম্বুল’।

আড্ডা যত গড়াল, বোঝা গেল বইটি কেবল কোনো শহরের ভ্রমণনামা নয়; এটি আসলে জীবনের এক পাণ্ডুলিপি। ৩ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত দিনাজপুর বন্ধুসভার পাঠচক্র ও আড্ডার শুরুতেই বন্ধু শামীম যখন বইটির গভীরতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন, লেখক এক টুকরো ম্লান হাসিতে মেলে ধরলেন তাঁর সৃষ্টির নেপথ্যকথা। শাকিল রেজা ইফতি বললেন, ‘আমি পারসপেক্টিভকে মূল্যায়ন করেই লিখি। নিজেকে প্রতিনিয়ত ইভালুয়েট করি।’

প্রশ্নের উত্তরে তিনি একটি ঘটনা শোনালেন, ‘আমি লেখার র ভার্সন রেখে দিই। একবার বৃষ্টিতে আমার নোটবুক ভিজে গিয়েছিল, লেখাগুলো সব ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল। তখনই এক অদ্ভুত উপলব্ধি হলো, এই হিজিবিজি শব্দগুলো দিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন কিছু! কারণ, প্রকৃতি আসলে এটাই চেয়েছিল। তাই হারানো নিয়ে তেমন উদ্বিগ্ন হই না।’

আরও বলেন, ‘লেখালেখির ক্যানভাসটা আমার কাছে খুব প্রিয়। কারণ, এখানেই আমার সব সুখ, সব দুঃখ লেখা যায়। এ জন্যই আমি আমার লেখার ক্যানভাসকে ভালোবাসি।’ কথাটি সবার খুবই পছন্দ হলো এবং বরবরের মতো বিমোহিত করল।

বন্ধু বিথী রায় প্রশ্ন করলেন, ‘আপনার লেখালেখি কখন থেকে শুরু?’ উত্তরে লেখক দারুণ একটি গল্প শোনালেন, ‘যখন বাবা বর্ডার গার্ডে কর্মরত ছিলেন, মোবাইল ছিল না। দাদি বলতেন, বাসার পাশের পুকুরে চিঠি ছাড়লে সেই চিঠি বাবার কাছে পৌঁছে যাবে। সেই পুকুরই ছিল আমার প্রথম ডাকঘর। এভাবেই চলতে চলতে লেখালেখি শুরু হয় টুকটাক। একবার রেজাল্ট খারাপ হওয়ায় আম্মু আমার একটি উপন্যাস ছিঁড়ে ফেলেছিলেন। কিন্তু আম্মু চলে যাওয়ার পর তাঁর লেখা অনেক ডায়েরি আবিষ্কার করলাম। এরপর লেখালেখিই হয়ে উঠল আমার প্রধান শক্তি।’

পাঠচক্র শেষে লেখক ও তাঁর সহধর্মিণীর সঙ্গে বন্ধুরা
ছবি: বন্ধুসভা

ওনার সহধর্মিণী মেহনাজ যখন খাবারের দর্শনের কথা তুললেন, লেখক শোনালেন এক অমোঘ সত্য, ‘আসলে খাবার থেকেই বুঝেছি অবস্থান পাল্টালেও মানুষের দর্শন, স্বাদ আর শব্দ পাল্টায় না। প্রবাসের চাপ থেকে মুক্তি পেতে স্বপ্ন আমাকে গ্রামীণ দৃশ্য আর দেশকেই দেখাত, আর প্রতিটি স্বপ্নকে আমি গুরুত্ব দিতাম।’

মেহনাজ যখন নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করলেন আড্ডার বিভিন্ন সময়ে, আর যুক্ত হলো এক নতুন মাত্রা। তাঁর মতে, এই বইটি কেবল ভ্রমণকাহিনি নয়, বরং এক ব্যতিক্রমী সংমিশ্রণ। মেহনাজ বললেন, ‘এই বই পড়লে আসলে লেখককেই পড়া যায়। আধুনিক লেখায় যে সমসাময়িক ও ব্যক্তিগত দর্শন সচরাচর পাওয়া যায় না, ইফতি সেখানে নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন। এটি কোনো গতানুগতিক জনরা নয়—গল্প, জীবনগল্প ও ভ্রমণকাহিনির এমন সংমিশ্রণ, যেখানে রয়েছে অভিজ্ঞতা, কল্পনা, উদ্ধৃতি, কবিতা ও চিঠি। বইটি আসলে গবেষণার দাবি তোলে, নতুন কোনো জনরা হিসেবে একে অন্তর্ভুক্ত করা যায় কি না।’

ইফতি যোগ করলেন, ‘আমি লেখালেখি কোনো কমার্শিয়াল দিক থেকে করি না। নিজের জন্যই লিখি। কিন্তু সেই নিজেরটাই কোনো না কোনোভাবে সবার হয়ে যায়…।’

দিনাজপুর বন্ধুসভার সভাপতি শবনম মুস্তারিন শোনালেন বইটি পড়ার কথা, ‘আসলে আমি নিজেই সন্দিহান, এটি কোন ধরনের বই। তবে আমি আর আমার বোন একসঙ্গে পড়েছি এবং এত ভালো লেগেছিল যে এক বসাতেই পড়ে ফেলি।’

আড্ডার শেষ ভাগে উঠে এল বাংলাদেশের হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য ও আঞ্চলিকতার কথা। আধুনিকতার ভিড়ে আমরা আমাদের নিজস্বতাকে হারিয়ে ফেলছি। এই গভীর উদ্বেগ থেকেই লেখক বন্ধুদের কাছে এক বিশেষ নিবেদন রাখলেন, ‘পরিবেশগত কারণে সবই পরিবর্তনশীল, তাই ভালো কিছুকে আমরা অন্যভাবে রক্ষা করতে পারি। শুধু উদ্বেগ প্রকাশ না করে আমরা একটা আর্কাইভ তৈরি করতে পারি। এমনকি ভোটের মাইকিং রেকর্ড করে ই–মেইলে রেখে দেওয়া বা ডকুমেন্টারি কনটেস্টের মাধ্যমে আমাদের হারিয়ে যাওয়া সুরগুলো ধরে রাখা সম্ভব।’

দিনাজপুরের সেই বিকেলে বোঝা গেল, ‘আমার ইস্তাম্বুল’ কেবল একটি শহরকে দেখার চোখ নয়, বরং শহরকে হৃদয়ে ধারণ করে নিজেকে চেনার এক দর্পণ। আড্ডা শেষ হলো সূর্যাস্তের পর। শেষে লেখক শাকিল রেজা ইফতির সেই কথাটি বন্ধুরা বিমোহিত হয়ে শুনছিল, ‘লেখা আসলে জায়গা বদলায় না, লেখা শুধু চোখ বদলায়। আমি আমার ক্যানভাসকে ভালোবাসি, সে সব দুঃখ–সুখ নেয়।’

সভাপতি, দিনাজপুর বন্ধুসভা