জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ‘নজরুল ও রবীন্দ্রনাথ—দুই মেরু, নাকি পরিপূরক?’—এই প্রশ্ন সামনে রেখে বিশেষ পাঠচক্রের আয়োজন করেছে গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (গোবিপ্রবি) বন্ধুসভা। পাঠচক্রে বাংলা সাহিত্যের দুই প্রভাবশালী কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য, ভাবধারা, গান, গজল ও পারিবারিক জীবন নিয়ে প্রাণবন্ত আলোচনা করেন বন্ধুরা।
আলোচনায় প্রথমেই দুই কবির লেখার ভাবধারা উঠে আসে। রবীন্দ্রনাথের লেখায় প্রেম, প্রকৃতি, মানবতা, সৌন্দর্য ও জীবনবোধ যেমন গুরুত্বপূর্ণ জায়গা পেয়েছে, একইসঙ্গে নজরুলের লেখায় বিদ্রোহ, সাম্য, অসাম্প্রদায়িকতা, প্রেম ও শোষণবিরোধী চেতনা বিশেষভাবে প্রকাশ পেয়েছে। তাঁদের লেখার ভাষা, বিষয় ও প্রকাশভঙ্গিতে পার্থক্য থাকলেও মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও মানবিকতার জায়গায় একই অবস্থান ও মতামত প্রকাশ করেন সবাই।
পাঠচক্রে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের সংগীত নিয়েও আলোচনা হয়। একজন বন্ধু বলেন, ‘বাংলা গানের জগতে রবীন্দ্রনাথের অবদান অসাধারণ, গানে রয়েছে মহাজাদু। তাঁর গান বাংলা সংগীতকে সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি মানুষের জীবনের নানা অনুভূতি ও অভিজ্ঞতাকে গভীরভাবে তুলে ধরেছে।’
আরেকজন বন্ধু নজরুলের গজল নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘বাংলা গজলের ক্ষেত্রে কাজী নজরুল ইসলামের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। প্রেম, বিরহ, আধ্যাত্মিকতা ও আবেগকে তিনি গজলের মাধ্যমে ভিন্ন এক মাত্রায় প্রকাশ করেছেন।’
আলোচনায় দুই কবির পারিবারিক অবস্থান ও বেড়ে ওঠার পরিবেশের বিষয়টিও উঠে আসে। রবীন্দ্রনাথ জন্মেছিলেন একটি শিক্ষিত, সংস্কৃতিমনা ও সমৃদ্ধ পরিবারে। অন্যদিকে নজরুলের শৈশব ও কৈশোর কেটেছে নানা অভাব-অনটন ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। জীবনের এই ভিন্ন অভিজ্ঞতা তাঁদের চিন্তা, জীবনদর্শন ও সাহিত্যকর্মে কীভাবে প্রভাব ফেলেছে, তা নিয়েও বন্ধুরা নিজেদের মতামত তুলে ধরেন।
একই সঙ্গে তাঁদের পারস্পরিক সম্পর্কের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। ভিন্ন সাহিত্যিক পথ ও চিন্তার জগৎ থাকলেও রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের মধ্যে ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সৌহার্দ্য। ফলে তাঁদের কেবল দুই বিপরীত মেরু হিসেবে দেখলে তাঁদের সাহিত্যিক সাদৃশ্য ও পারস্পরিক প্রভাবের অনেকটাই আড়ালে থেকে যায়।
পাঠচক্রের আলোচনায় শেষ পর্যন্ত উঠে আসে—রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও তাঁরা পরস্পরের বিরোধী নন; বরং তাঁদের ভিন্নতা বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। একজন বাংলা সাহিত্যে সৌন্দর্য, মানবতা ও জীবনবোধের গভীরতা তৈরি করেছেন, অন্যজন বিদ্রোহ, সাম্য ও শোষণবিরোধী চেতনায় সাহিত্যে নতুন শক্তি এনেছেন।
নজরুলের ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এই পাঠচক্র তাই শুধু একজন কবিকে স্মরণ করার আয়োজন হয়ে থাকেনি; বরং রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলকে পাশাপাশি রেখে তাঁদের সাহিত্য, চিন্তা ও সৃষ্টিকে নতুন করে দেখার একটি সুযোগ তৈরি করেছে। শিক্ষার্থীদের মতবিনিময় ও গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় সাহিত্য সংসদের অংশগ্রহণে পাঠচক্রটি হয়ে ওঠে সাহিত্যভাবনা ও মুক্ত আলোচনার একটি প্রাণবন্ত আয়োজন।
পরিবেশ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক, গোবিপ্রবি বন্ধুসভা