জাহানারা ইমাম ছিলেন একাধারে লেখক, কথাসাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ। তাঁর জীবনবোধ ও আদর্শ ছিল তৎকালীন বাঙালি মহিলাদের থেকে অনেকটাই ব্যতিক্রম। তিনি ১৯২৯ সালে ভারতের মুর্শিদাবাদে একটি রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও শিক্ষাগত জীবন ছিল অনেক সমৃদ্ধ। তাঁর কর্মজীবনের অধিকাংশ সময় ব্যয় হয় শিক্ষক হিসেবে। সাহিত্যিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে ছোটগল্পের মাধ্যমে। ১৯৭১ সালে তাঁর লেখা দিনলিপি পরবর্তী সময়ে ‘একাত্তরের দিনগুলি’ নামে গ্রন্থিত হয়, যা প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৮৬ সালে।
‘একাত্তরের দিনগুলি’ বই নিয়ে ভার্চ্যুয়াল পাঠচক্রের আসর করেছে সিলেট বন্ধুসভা। ১০ মার্চ এটি অনুষ্ঠিত হয়।
গ্রন্থটিতে লেখক জাহানারা ইমাম যতটুকু না তিনি নিজে, তার থেকে অনেক বেশি ভূমিকা পালন করেন একজন মা, একজন স্ত্রী হিসেবে। ১ মার্চ থেকে ১৭ ডিসেম্বর ১৯৭১—সময়কাল হিসাবে মাত্র ২৯১ দিনের ঘটনাপ্রবাহ গ্রন্থটিতে তুলে ধরা হয়েছে। তত দিনে একটি সবুজ মানচিত্রের রক্তক্ষরণে রাঙা হয়ে উঠেছে শহীদজননীদের হৃদয়।
বইটি শুরু হয় ১ মার্চ ১৯৭১–এর বিবরণের মাধ্যমে। ঢাকার অবস্থা দিন দিন আরও বেশ টালমাটাল হচ্ছিল। চারদিকে মিটিং-মিছিল-উত্তেজনা। হঠাৎ ২৫ মার্চের কালরাতের অন্ধকার ঢেকে ফেলে সবকিছুকে। সেই অন্ধকারে একের পর এক আগুনের শিখায় জ্বলে উঠতে থাকে ঢাকা শহরের বস্তি আর হিন্দু–অধ্যুষিত এলাকাগুলো। লেখক দিনগুলোকে জীবন্ত করে তুলে ধরেছেন অনন্তকালের জন্য। সেই দিনগুলোর আঁচে লেখকের বড় ছেলে রুমীও পুড়ছিলেন। সে কারণেই হয়তো নিশ্চিত জীবনের মায়া ছেড়ে মায়ের কাছে অনুমতি চান যুদ্ধে যাওয়ার। জাহানারা ইমাম সেদিন বলেছিলেন, ‘দিলাম তোকে দেশের জন্য কুরবানি করে।’ তখন বোধ হয় অদূর ভবিষ্যতের নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাস লেখক শুনতে পাননি। যত দিনে তিনি তা অনুভব করেছিলেন; তত দিনে পূর্ব কোণে উদীয়মান রক্তেরাঙানো স্বাধীনতার সূর্য। লেখক নিজের ঘরকেই দুর্গে পরিণত করেছিলেন, আর সেই দুর্গের ভিত্তি ছিল বিশ্বাস, দৃঢ়তা ও অটল সাহসিকতা।
পাঠচক্র পর্যালোচনায় বন্ধু প্রণব চৌধুরী বলেন, ‘একাত্তরের দিনগুলি’ কোনো সাধারণ উপন্যাস কিংবা গল্পের মতো নয়, এটি মূলত একটি দিনলিপি। যেখানে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিসংগ্রাম একটি সাধরণ পরিবারকে কীভাবে স্পর্শ করেছিল, তার নিখুঁত চিত্র পাওয়া যায়।
বন্ধু জামিউল হাসান বলেন, “‘একাত্তরের দিনগুলি” আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দলিল।’
বন্ধু অনুপমা দাস লেখক পরিচিতিতে বলেন, জাহানারা ইমাম হয়তো নিজের অসংখ্য পরিচয়ের ভিড়েও নিজেকে শহীদজননী হিসেবে পরিচয়টিকেই সবচেয়ে বেশি গর্ব ও স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে ধারণ করতেন।
নামকরণের স্বার্থকতা উপস্থাপন করে বন্ধু কিশোর দাশ বলেন, লেখক নিজের দেখা ১৯৭১–এর দৈনিক ঘটনাপ্রবাহকে লিপিবদ্ধ করেন। তাঁর নিজের উপলব্ধি, আবেগ ও অনুভূতির সম্মিলিত রূপ ‘একাত্তরের দিনগুলি’।
পাঠচক্রে আরও উপস্থিত ছিলেন বন্ধু সমরজিত হালদার, শাহরিয়ার আহমেদ, প্রত্যাশা তালুকদার, সৌম্য মন্ডল, প্রাণেশ দাস, আহসানউল্লাহ খান, শুভ তালুকদার, অমিত দেবনাথসহ অনেকে।
পাঠাগার ও পাঠচক্র সম্পাদক, সিলেট বন্ধুসভা