লেখক আহমদ ছফার বিখ্যাত উপন্যাস ‘গাভী বিত্তান্ত’ নিয়ে হিরন্ময় কথকতা সিরিজ পাঠচক্রের ৩০তম আসর করেছে চট্টগ্রাম বন্ধুসভা। ২৩ জুন বিকেলে চট্টগ্রাম বন্ধুসভা কক্ষে এটি অনুষ্ঠিত হয়।
শুরুতেই চট্টগ্রাম বন্ধুসভার বন্ধু ও সাবেক উপদেষ্টা প্রয়াত মিনহাজ হোসেনকে স্মরণ করতে গিয়ে পাঠাগার ও পাঠচক্র সম্পাদক কামরান চৌধুরী বলেন, ‘২০২৪ সালে “গাভী বিত্তান্ত” বইটি নিয়ে পাঠচক্রের জন্য মিনহাজ ভাইকে আলোচক হিসেবে চেয়েছিলাম। তিনি তখন ব্যস্ত ছিলেন বলে আর করা হয়ে ওঠেনি। গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়েও চেষ্টা করেছিলাম; তখনো তিনি ব্যস্ততার কারণে সময় দিতে পারেননি। ভেবে নিয়েছিলাম, তিনি হয়তো অবসরে একদিন আমাদের সঙ্গে এই বই নিয়ে পাঠচক্র করবেন। কিন্তু তা আর কখনো সম্ভব হয়ে উঠবে না। খুবই অল্প সময়ে এমন একজন জ্ঞানী ও বিনয়ী মানুষকে এই পৃথিবী থেকে আমরা হারিয়ে ফেলেছি। আজকের পাঠচক্রটি তাঁকে উৎসর্গ করা হচ্ছে।’
এরপর প্রয়াত মিনহাজ হোসেনকে স্মরণ করে বন্ধুরা দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করেন।
পাঠ আলোচনায় উপদেষ্টা জয়শ্রী দাশ বলেন, ‘গাভী বিত্তান্ত’ বইটি লেখক আহমদ ছফার কেবল একটি সাহিত্যকর্মই নয়; বরং বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ক্ষমতার রাজনীতি, তোষামোদের সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক অবক্ষয়ের এক নির্মম দলিল। ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত এই উপন্যাসে আহমদ ছফা এমন এক বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস্তবতা তুলে ধরেছেন, যেখানে জ্ঞানচর্চার চেয়ে ক্ষমতা, ব্যক্তিস্বার্থ ও সুবিধাবাদ বড় হয়ে ওঠে।
উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র ড. মিয়া মোহাম্মদ আবু জুনায়েদ। তিনি বাংলাদেশের খুব প্রাচীন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। ক্ষমতার আসনে বসার পর তিনি ধীরে ধীরে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থের চেয়ে নিজের পদ ও মর্যাদা রক্ষায় বেশি মনোযোগী হয়ে ওঠেন। তাঁর চারপাশে গড়ে ওঠে তোষামোদকারী ও সুবিধাবাদীদের একটি বলয়। অন্যদিকে তাঁর স্ত্রী নুরুন্নাহার বানু এই উপন্যাসের একটি উল্লেখযোগ্য চরিত্র। তিনি স্বামীর ক্ষমতা ও সামাজিক মর্যাদাকে বিশেষ গুরুত্ব দেন এবং উপাচার্য পরিবারের অভিজাত জীবনযাপনের প্রতীক হিসেবে উপস্থিত হন। তিনি মনে করেন, তাঁর স্বামী তাঁর বাবার টাকায় পড়ালেখা করে আজ এই জায়গায় আসতে পেরেছেন।
জয়শ্রী দাশ বলেন, এ ছাড়া উপন্যাসে দিলরুবা খানম একজন প্রভাবশালী শিক্ষক। তিনি ক্ষমতার রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি। অন্যদিকে ঠিকাদার শেখ তবারক আলী উপাচার্যকে একটি গাভি উপহার দেন। এই গাভিকে কেন্দ্র করেই উপন্যাসের মূল ঘটনাপ্রবাহ গড়ে ওঠে। এর নামও দেওয়া হয় তরনী। এখানে গাভি কোনো সাধারণ প্রাণী নয়; এটি ক্ষমতা, তোষামোদ ও অন্ধ আনুগত্যের প্রতীক। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে যেখানে শিক্ষা ও গবেষণা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কথা, সেখানে একটি গাভিকে ঘিরে শিক্ষক–কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত ব্যস্ততা যেন পুরো ব্যবস্থাপনার নৈতিক সংকটকে প্রকাশ করে। আহমদ ছফা অত্যন্ত তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গের মাধ্যমে দেখিয়েছেন, যখন কোনো প্রতিষ্ঠানে যোগ্যতার চেয়ে আনুগত্য, সত্যের চেয়ে সুবিধা এবং নীতির চেয়ে ক্ষমতা বড় হয়ে ওঠে, তখন সেই প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে তার মূল উদ্দেশ্য হারিয়ে ফেলে।
সহসভাপতি নুরুজ্জামান খান বলেন, ‘সেদিন শহর থেকে কক্সবাজার যাওয়ার পথে বইটি পড়েছিলাম। লেখক আহমদ ছফা হাস্যরসাত্মক ও অত্যন্ত নিখুঁতভাবে বইটি লিখেছেন যে, যেন চোখের সামনে বর্তমান কিছু দৃশ্যপট দেখছি। লেখকের এমন মুনশিয়ানা সত্যিই প্রশংসনীয়।’
পাঠচক্র শেষে কুইজ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। সেরা তিন বিজয়ীকে পুরস্কৃত করা হয়। বিজয়ীরা হলেন পরিবেশ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক শান্ত বড়ুয়া, দপ্তর সম্পাদক সাকিব জিশান ও সাধারণ সম্পাদক ইরফাতুর রহমান।
পাঠচক্রে আরও উপস্থিত ছিলেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন, মুক্তিযুদ্ধ ও গবেষণা সম্পাদক আফিফ ইব্রাহীম, কার্যনির্বাহী সদস্য মারুফ উল হকসহ অন্য বন্ধুরা।
পাঠাগার ও পাঠচক্র সম্পাদক, চট্টগ্রাম বন্ধুসভা