জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ সাতক্ষীরায় বন্ধুসভার সবুজের অঙ্গীকার

রাস্তার পাশে গাছের চারা রোপণ করেন সাতক্ষীরায় বন্ধুসভার বন্ধুরাছবি: বন্ধুসভা

তীব্র রোদ। চারদিকে জল আর জল। কোথাও বিস্তীর্ণ মৎস্যঘের, কোথাও ঘেরের পাড় ধরে চলে গেছে সড়ক। এমন এক দুপুরে মহেশ্বরকাটির পথে ছুটছিল কয়েকটি মোটরসাইকেল। শহরের কোলাহল পেছনে ফেলে প্রায় ২০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে সেখানে পৌঁছান একদল তরুণ। তাঁদের হাতে ছিল গাছের চারা। উদ্দেশ্য শুধু গাছ লাগানো নয়, উপকূলের জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ জনপদে সবুজের পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি মানুষের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতার বার্তা পৌঁছে দেওয়া।

২১ আগস্ট সকালে সাতক্ষীরা বন্ধুসভার উদ্যোগে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে এমন দৃশ্য দেখা যায়। সাতক্ষীরা শহরের পোস্ট অফিস মোড় থেকে যাত্রা শুরু করে বন্ধুসভার সদস্যরা আশাশুনি উপজেলার মহেশ্বরকাটিতে পৌঁছান। পরে সাতক্ষীরা-আশাশুনি মহাসড়কের দুই পাশে বিস্তীর্ণ মৎস্যঘেরের পাড়ে বিভিন্ন লবণসহিষ্ণু গাছের চারা রোপণ করেন তাঁরা।

আবহাওয়া ছিল বেশ গরম। সাতক্ষীরায় এদিন তাপমাত্রা ছিল প্রায় ৩১ থেকে ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস, সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল প্রায় ৩৩ থেকে ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। প্রখর রোদ উপেক্ষা করেই বৃক্ষরোপণে অংশ নেন বন্ধুসভার বন্ধুরা।

উপকূলীয় সাতক্ষীরায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নতুন কোনো বিষয় নয়। লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন ও জীববৈচিত্র্যের ওপর চাপ। সব মিলিয়ে এখানকার মানুষের জীবন-জীবিকা ক্রমেই পরিবেশগত নানা ঝুঁকির মুখে পড়ছে। এমন বাস্তবতায় গাছ লাগানোকে শুধু সৌন্দর্যবর্ধনের কর্মসূচি হিসেবে দেখছেন না বন্ধুসভার সদস্যরা। তাঁদের কাছে এটি জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় স্থানীয়ভাবে নেওয়া একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।

সাতক্ষীরায় বন্ধুসভার বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি
ছবি: বন্ধুসভা

মহেশ্বরকাটির ঘেরপাড়ে রোপণ করা একটি চারার দিকে তাকালে সেই উদ্যোগের আরেকটি বার্তা চোখে পড়ে। সদ্য লাগানো চারাটি যাতে বাতাসে হেলে পড়ে বা নষ্ট হয়ে না যায়, সে জন্য পাশে বাঁশের চটা দিয়ে ঠেকনা দেওয়া হয়েছে। ঠেকনার মাথায় বাঁধা হয়েছে লাল কাপড়। দূর থেকে দেখলে লাল কাপড়টি চোখে পড়ে সহজেই। কিন্তু এর অর্থ যেন আরও গভীর, গাছ লাগানোই শেষ কথা নয়, তাকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্বও নিতে হবে।

সাতক্ষীরা বন্ধুসভার সভাপতি মৃত্যুঞ্জয় কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘সাতক্ষীরা জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোর একটি। এই বাস্তবতায় বৃক্ষরোপণ শুধু একটি সামাজিক কর্মসূচি নয়, এটি পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তোলার উদ্যোগ। বন্ধুসভার পক্ষ থেকে আমরা প্রতিবছর বৃক্ষরোপণ করি। এবারও উপকূলের বাস্তবতা বিবেচনায় লবণসহিষ্ণু বিভিন্ন গাছের চারা রোপণ করেছি।’

সহসভাপতি রুহুল আমিন বলেন, ‘আজ আমরা যে চারাগুলো রোপণ করেছি, সেগুলো এখন ছোট। বাতাসে যাতে পড়ে না যায়, তাই পাশে বাঁশের ঠেকনা দেওয়া হয়েছে। ঠেকনায় বাঁধা লাল কাপড়টাও যেন আমাদের একটি বার্তা দেয়, গাছ লাগানোর পর তাকে রক্ষা করতে হবে। একটি গাছ বড় হতে সময় লাগে। তাই ধৈর্য ও নিয়মিত পরিচর্যা প্রয়োজন। আমরা যদি প্রত্যেকে নিজের লাগানো একটি গাছের দায়িত্ব নিই, তাহলে আগামী কয়েক বছরে সাতক্ষীরার রাস্তা, ঘেরের পাড় ও বিভিন্ন খোলা জায়গা অনেক বেশি সবুজ হয়ে উঠতে পারে।’

কর্মসূচিতে আরও উপস্থিত ছিলেন সাধারণ সম্পাদক আবু তাহের বিল্যাহ, সহসভাপতি রাহাতুল ইসলাম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোকাররাম বিল্লাহ, সহসাংগঠনিক সম্পাদক নাইমুর রহমান, ম্যাগাজিন সম্পাদক শাওন হোসাইন, সাংস্কৃতিক সম্পাদক শিরিনা আক্তার, সাংগঠনিক সম্পাদক করিমন নেছা, পাঠাগার ও পাঠচক্র সম্পাদক সুদীপ্ত দেবনাথ, বইমেলা সম্পাদক কাজী রুবায়েত, স্বাস্থ্য ও ক্রীড়া সম্পাদক শারমিন রিয়া, কার্যনির্বাহী সদস্য গোলাম হোসেন ও হোসেন আলী, বন্ধু ইসমাইল হোসেন, আল আমিন, প্রতাপ পোড়, নওশীন জামান, ইসরাত জাহান, মুশফিক উর রহমান, সামিন তায়হান,  সামছুল আরেফিনসহ অন্য বন্ধুরা।

সাধারণ সম্পাদক, সাতক্ষীরা বন্ধুসভা