ভোরের কুয়াশা তখনো পুরোপুরি কাটেনি। ব্রহ্মপুত্র পাড়ি দিয়ে আরও ১০ কিলোমিটার গন্তব্য। রাস্তা থেকে মাদ্রাসার পথে হাঁটতে হাঁটতে পায়ের নিচে ঠান্ডা মাটি কেঁপে উঠছিল। ময়মনসিংহ সদর উপজেলার পরানগঞ্জ ইউনিয়নের টান হাসাদিয়া হাসানুল উলুম ইউসুফবিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানার আঙিনায় ঢুকতেই চোখে পড়ল শিশুদের। চোখে কৌতূহল, শরীরে শীতের চাপা কাঁপুনি। পাশে দাঁড়িয়ে বয়োবৃদ্ধ নারী-পুরুষ, তাঁদের চোখেও উৎসুক অপেক্ষা। বন্ধুসভার বন্ধুদের হাতে ছিল উষ্ণতার উপহার। সম্প্রতি এই মানুষদের হাতে যখন ময়মনসিংহ বন্ধুসভার পক্ষ থেকে শীতবস্ত্র তুলে দেওয়া হলো, মাদ্রাসার নিরিবিলি পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ল একধরনের নীরব স্বস্তি।
কম্বল হাতে নিয়ে হাসাদিয়া গ্রামের শাহজাহান মণ্ডল (৫০) বলেন, 'শীত আইলে আমরার কষ্টটা বেশি হয়। চরের রাইতগুলায় খুব হিয়েন পড়ে। এর লাইগ্যা অনেক সময় ঠিকমতো ঘুমাইতেও হারি না। আইজ এই কম্বল পায়া মনে হইল, কেউ আমরার কথা ভাবে। তোমরার দেওয়া কম্বলডা শুধু শরীরে না, মনেও সাহস জোগাইল।'
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার বরেন্দ্রভূমির প্রত্যন্ত এলাকা বড়বন সাঁওতাল গ্রামে বসবাস করে ৩৭টি পরিবার। পাশেই আমনূরা সুইপার কলোনির হরিজনপল্লিতে থাকে আরও ১৮টি পরিবার। নানা কষ্টের মধ্য দিয়ে চলে তাদের জীবন। এই পরিবারগুলোসহ পৌর এলাকার আরও ২৭টি নিম্ন আয়ের পরিবারের মধ্যে কম্বল বিতরণ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ বন্ধুসভা।
কম্বল পেয়ে পরিবারগুলোর সদস্যদের মুখে ফুটে ওঠে স্বস্তির হাসি। সাঁওতাল বৃদ্ধা চুনিয়া মুর্মু (৭০) আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, 'বলা নাই, কহা নাই, তোরা আসিয়ে কম্বলটো দিলি। খুব ভালো হইলো। জাড়ে (শীতে) আরাম পাবো। তোরা ভালো থাকিস রে বাপ।'
দুই ধাপে পাবনার আমিনপুর থানাধীন সাগরকান্দি ইউনিয়নের কাসিমুল উলুম মাদ্রাসা ও আশপাশের এলাকা এবং মাশুন্দিয়া ইউনিয়ন ও ঢালার চর ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রামে শীতবস্ত্র বিতরণ করে দয়ালনগর বন্ধুসভা। দুই দিনে প্রায় ৫০০ কম্বল উপহার দেয় তারা।
এ বছর দেশের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে অনেক বেশি শীত পড়েছে। এতে জনজীবন বিপর্যস্ত। এ অবস্থায় শীতার্তদের পাশে দাঁড়িয়েছে সারা দেশের স্থানীয় বন্ধুসভাগুলো— কোথাও নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী এবং সুহৃদদের অর্থায়নে, আবার কোথাও প্রথম আলো ট্রাস্টের সহযোগিতায়। সংগৃহীত অর্থ দিয়ে শীতবস্ত্র কিনে বন্ধুরা পৌঁছে যাচ্ছেন শীতার্তদের কাছে।
সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার সেনাপতি টিলার ভাষা শিক্ষা ও সংস্কৃতি চর্চাকেন্দ্রে স্থানীয় লোকজনের মধ্যে শীতবস্ত্র বিতরণ করে শাবিপ্রবি বন্ধুসভা। ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি বন্ধুসভার বন্ধুরা নেন ভিন্ন উদ্যোগ। প্রথমে ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস ঘুরে ঘুরে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে শীতবস্ত্র সংগ্রহ করেন। তারপর সেগুলো রাজধানীর তেজগাঁও রেলস্টেশনে ছিন্নমূল মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হয়।
দিনাজপুর সদর উপজেলার আউলিয়াপুর ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামে শীতার্তদের মধ্যে কম্বল উপহার দিতে গেলে খুশি হয়ে বন্ধুসভার বন্ধুদের ঘুঘুডাঙ্গা গ্রামের বর্ষীয়ান রফিউদ্দীন মৌলভি (১০৫) বলেন, 'এইবার শীত এংনা বেশি পড়োছে। রাইতত ঠান্ডা বেশি। শীলশীল করি বাতাস বহেচে। অনেক বেলা হচে তাও রোদ আইসে না। ঠান্ডাত হামাক কম্বলটা দিলেন। কম্বল উড়ি (গায়ে দিয়ে) কামকাজ করমো, নামাজ পড়া যাইবে। কম্বলটা পায়া হামার খুব উপকার হইল।'
ফরিদপুর বন্ধুসভা শীতবস্ত্র বিতরণ করে সদরপুর উপজেলার বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চল দিয়ারা নারকেলবাড়িয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের মানুষের মধ্যে। সড়ক ও নৌপথ মিলিয়ে শহর থেকে দূরত্ব প্রায় ৫৭ কিলোমিটার। কম্বল উপহার পেয়ে স্থানীয় বাসিন্দা রাহেলা বিবি (৮৭) বলেন, 'নদীভাঙনের শিকার হইছি কয়েকবার। শীত নামলে আমাগের জীবন থাইমা যায়। রাইতে ঘুম অয় না, গা ঠান্ডায় শক্ত হইয়া যায়, কালাইয়া আসে। ঘরে আলো নাই, পাটখড়ির বেড়ার ফাঁক দিয়া বাতাস ঢুইকা পড়ে। পুরান কাপড় দিয়া কত আর ঢাকমু? আইজ এই কম্বল পাইয়া মনে অইছে, রাইতে ঘুমডা আরামের হবেনে।
শীতার্তদের মধ্যে উষ্ণতা ছড়িয়ে দিতে গত ডিসেম্বর মাস থেকেই চলছে প্রথম আলো বন্ধুসভার এই কার্যক্রম। জিসান গ্রুপের সহযোগিতায় শীতবস্ত্র বিতরণ করেছে সুনামগঞ্জ, মোংলা ও ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া বন্ধুসভা। এ ছাড়া এরই মধ্যে এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে সৈয়দপুর, কুড়িগ্রাম, যশোর, রাজবাড়ী, চুয়াডাঙ্গা, লালমনিরহাট, ঠাকুরগাঁও, নওগাঁ, নীলফামারী, রংপুর, পঞ্চগড়, মৌলভীবাজারসহ অন্যান্য বন্ধুসভা।