কিছু বই খাবার নিয়ে লেখা হয়, কিছু বই স্বপ্ন নিয়ে, আর কিছু বই মানুষের একাকিত্ব নিয়ে। ‘অ্যাপেটাইট’ এই তিনটিকে একই টেবিলে বসিয়েছে। পি.পারমিতার প্রথম উপন্যাস ‘অ্যাপেটাইট’-এর কেন্দ্রীয় চরিত্র জেরিনা, নিউ হ্যাভেনের একটি রেস্তোরাঁয় কাজ করা তরুণ বাংলাদেশি-আমেরিকান নারী। রান্না তার কাছে শুধু পেশা নয়; নিজের পরিচয়, শিকড় এবং ভবিষ্যৎকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার একটি পথ। তার স্বপ্ন, একদিন যুক্তরাষ্ট্রে নিজের একটি বাংলাদেশি ফিউশন রেস্টুরেন্ট তৈরি করা। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, কর্মক্ষেত্রের অবমূল্যায়ন, পারিবারিক টানাপোড়েন এবং নিজের ভেতরের দ্বিধা—সবকিছুই তাকে টেনে ধরে।
ঠিক তখনই তার জীবনে প্রবেশ করে সিয়েরা মিস্ট, পেশাদার কুস্তির জগতের এক তারকা। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, এটি রান্না আর কুস্তির এক অদ্ভুত মিশ্রণ। কিন্তু বইটি এগোতে থাকলে বোঝা যায়, লেখক পারমিতা আসলে দুটি আলাদা জগৎকে পাশাপাশি রেখে একই প্রশ্ন করছেন—মানুষ আসলে কিসের জন্য ক্ষুধার্ত? খাবারের জন্য? স্বীকৃতির জন্য? ভালোবাসার জন্য? নাকি এমন একজন মানুষের জন্য, যে তাকে অন্য সবার চেয়ে আলাদা করে দেখবে?
ভৈরব বন্ধুসভার ২০৮তম পাঠের আসরে গ্রন্থ আলোচনায় কথাগুলো বলেন সাবেক সভাপতি নাহিদ হোসাইন। সম্প্রতি প্রথম আলোর ভৈরব অফিসে এই আসর বসে। বিষয় ছিল পি. পারমিতার লেখা উপন্যাস ‘অ্যাপেটাইট’। সঞ্চালনা করেন পাঠচক্র ও পাঠাগার সম্পাদক মহিমা মেধা।
লেখক সম্পর্কে আলোচনা করেন সভাপতি জান্নাতুল মিশু। লেখকের জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকার বুকে। পড়াশোনা করেছেন ঢাকার স্বনামধন্য সানবিমস স্কুলে। এরপর উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান সুদূর যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানকার বিখ্যাত ওয়েলেসলি কলেজ থেকে স্নাতক এবং বিশ্বখ্যাত কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে ক্রিয়েটিভ রাইটিংয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন।
লেখক পারমিতার এই সফলতার গল্প কোনো সাধারণ চড়াই-উতরাইয়ের নয়। মার্কিন প্রকাশনা জগতের অন্যতম শীর্ষ প্রতিষ্ঠান ‘দ্য ডায়াল প্রেস’ একবার এক সপ্তাহের জন্য একটি বিরল উন্মুক্ত আহ্বান জানিয়েছিল, যেখানে যে কেউ তাঁদের পাণ্ডুলিপি জমা দিতে পারতেন। নাম-পরিচয় গোপন রেখে জমা পড়া প্রায় এক হাজার বেনামী পাণ্ডুলিপির মধ্যে বিচারকদের চোখ আটকে যায় পারমিতার লেখায়। হাজারো লেখার মধ্য থেকে একমাত্র সেরা হিসেবে নির্বাচিত হয়ে আলোর মুখ দেখে ‘অ্যাপেটাইট’। প্রকাশের আগেই ডেবিউটিফুল এবং ইলেকট্রিক লিটারেচার-এর মতো বিশ্বখ্যাত সাহিত্য সাময়িকীগুলো ‘অ্যাপেটাইট’কে ২০২৬ সালের অন্যতম প্রতীক্ষিত বই হিসেবে ঘোষণা করে।
নাহিদ হোসাইন বলেন, ‘কোনো তারকার কাছ থেকে পাওয়া স্বীকৃতি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের হাজারো লাইক, কিংবা প্রিয় মানুষের সামান্য মনোযোগ—এসবের কোনোটিই নিজের জীবনের জায়গা পূরণ করতে পারে না। নিজের জন্য তৈরি করা স্বপ্নের জায়গাটি শেষ পর্যন্ত নিজেকেই তৈরি করতে হয়।’
হয়তো এ কারণেই ‘অ্যাপেটাইট’-এর সবচেয়ে সুন্দর দিক তার রান্নার বর্ণনা নয়, রেসলিংয়ের উত্তেজনাও নয়; বরং সেই মুহূর্ত, যখন একজন তরুণী ধীরে ধীরে বুঝতে শেখে—অন্য কারও জীবনে বিশেষ হয়ে ওঠার চেয়ে নিজের জীবনের গল্পে নিজের জায়গাটি তৈরি করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পি. পারমিতার ‘অ্যাপেটাইট’ তাই শেষ পর্যন্ত খাবার, কুস্তি কিংবা একজন তারকার প্রতি ভক্তির গল্পের চেয়ে বড় কিছু। এটি এমন এক প্রজন্মের গল্প, যারা একই সঙ্গে বাস্তব পৃথিবী এবং ইন্টারনেটের পৃথিবীতে বাস করে; যারা দূরের মানুষকে খুব কাছের মনে করতে পারে; যারা স্বপ্ন দেখতে জানে, কিন্তু কখনো কখনো অন্যের স্বপ্নে হারিয়ে যায়। হয়তো সত্যিকারের ক্ষুধা তখনই শেষ হয়, যখন আমরা বুঝতে পারি, আমরা আসলে কী খুঁজছিলাম। আমাদের ক্ষুধাটা আসলে কোথায়?
গ্রন্থ আলোচনায় আরও অংশ নেন প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক সুমন মোল্লা। তিনি ইংরেজি সাহিত্যের নানা দিক সম্পর্কে আলোচনা করেন। পাঠের আসরে আরও উপস্থিত ছিলেন সহসভাপতি আফিসা আলী, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাফিস রহমান, মুক্তিযুদ্ধ ও গবেষণা সম্পাদক ভুবন আহমেদ, পরিবেশ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক হেপি বেগমসহ অনেকে।
বন্ধু, ভৈরব বন্ধুসভা