প্রকৃতির কোলে বন্ধুত্বের জয়গান

সুসং দুর্গাপুরে জামালপুর বন্ধুসভার বন্ধুরাছবি: বন্ধুসভা

পাহাড়, নদী ও প্রকৃতির রূপসুধা অবগাহন করার পাশাপাশি নিজেদের মধ্যকার সৌহার্দ্য ও ভালোবাসার বন্ধন আরও সুদৃঢ় করতে আনন্দভ্রমণ করেছে জামালপুর বন্ধুসভা। দিনব্যাপী এই ভ্রমণে বন্ধুরা ঘুরে দেখেন নেত্রকোনার সুসং দুর্গাপুরের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান। যাতায়াত পথের নানা নাটকীয়তা, ট্রেনের জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষা, একঝাঁক তরুণের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস আর পারস্পরিক ভালোবাসার এক অনন্য উপাখ্যান হয়ে থাকবে মিশন বিরিশিরি।

ট্রেনে আনন্দের মুহূর্ত
ছবি: বন্ধুসভা

রাতের ট্রেন, গান, আড্ডা ও যাত্রার শুরু
ভ্রমণের সূচনা হয় ২১ আগস্টের শেষ প্রহরে। রাত ৩টা ১১ মিনিটে জামালপুর রেলস্টেশন থেকে যমুনা এক্সপ্রেস ট্রেনে চড়ে ময়মনসিংহের উদ্দেশে রওনা দেন বন্ধুরা। রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে ট্রেনের বগিতেই শুরু হয় এক অন্য রকম উৎসব। এক পাশে তারুণ্যের বাঁধভাঙা নাচ–গান আর সুরেলা আসর, অন্য পাশে প্রাণবন্ত হাসাহাসি ও খোশগল্প—সব মিলিয়ে ট্রেনের আবহ হয়ে ওঠে উৎসবমুখর। ক্লান্তি ভুলতে কাউকে কাউকে সিটে হেলান দিয়ে মিষ্টি ঘুমে ঢলে পড়তেও দেখা যায়।

ভোরে ময়মনসিংহ রেলস্টেশনে পৌঁছে নেত্রকোনার জারিয়াগামী ট্রেনের জন্য সকাল ছয়টা থেকে সাতটা পর্যন্ত দীর্ঘ অপেক্ষার পরও ট্রেনের দেখা না মেলায় তাৎক্ষণিক বিকল্প সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। রেলস্টেশন থেকে দ্রুত ময়মনসিংহ বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে বাসে চড়ে সরাসরি দুর্গাপুরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু হয়।

শান্ত ও স্নিগ্ধ সোমেশ্বরী নদী নৌকায় করে পার হওয়ায় সময়
ছবি: বন্ধুসভা

নদী পারাপার ও বিরিশিরির সৌন্দর্য দর্শন
দুর্গাপুর বাসস্ট্যান্ডে নেমে মিনিট দশেক হেঁটে সকালের নাশতা সেরে নেওয়া হয়। শান্ত ও স্নিগ্ধ সোমেশ্বরী নদী নৌকায় পার হয়ে অটোবাইকে শুরু হয় মূল দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে দেখার রোমাঞ্চ। সারা দিনের ভ্রমণে বন্ধুরা ঘুরে দেখেন সুসং দুর্গাপুরের ঐতিহাসিক জমিদারবাড়ি, বিজয়পুরের চিনামাটির পাহাড় ও স্বচ্ছ নীল পানির হ্রদ, রানীখং পাহাড় ও শতবর্ষী ক্যাথলিক গির্জা, বিজয়পুর বিজিবি ক্যাম্প ও সীমান্ত জিরো পয়েন্ট এবং সবুজে ঘেরা কমলা পাহাড়।

বিজয়পুরের চিনামাটির পাহাড়ে
ছবি: বন্ধুসভা

খেলাধুলা, র‍্যাফল ড্র ও বন্ধুত্বের রং
পাহাড়ের কোল ঘেঁষে বন্ধুদের অংশগ্রহণে আয়োজন করা হয় প্রাণবন্ত খেলাধুলা ও আকর্ষণীয় র‍্যাফল ড্র। আনন্দঘন প্রতিযোগিতা শেষে বিজয়ীদের হাতে তুলে দেওয়া হয় চমৎকার সব পুরস্কার। এই সফরের অন্যতম বিশেষ দিক ছিল দলের সবার একে অপরের প্রতি নিখাদ ভালোবাসা ও সহমর্মিতা।

বিজয়পুরের চিনামাটির পাহাড়ে
ছবি: বন্ধুসভা

অংশগ্রহণকারী বন্ধুরা
‘মিশন বিরিশিরি’র এই আনন্দযাত্রায় অংশ নেন নাজমুল ইসলাম, মেহেদী হাসান খান, রিদয়, নাসির, শাখাওয়াত, কামরুল, হামজা, নাহিদ, বাকি বিল্লাহ, অন্তরা, ফারজানা, শামীম, সাব্বির, সীমান্ত, আবিদা, ফয়সাল, তানভির অয়ন, রাহিম, জেরিন, সৃষ্টি, আদিল, বিপু ও শ্রাবন্তী।

ছবি: বন্ধুসভা

বিশ্রামাগারের আড্ডা, ক্লান্তির ঘুম ও ঘরে ফেরা
দিন শেষে ঘরে ফেরার পথেও ছিল নাটকীয় অ্যাডভেঞ্চার। সন্ধ্যা ছয়টায় জারিয়া রেলস্টেশনে দীর্ঘ অপেক্ষার পরও ট্রেন না পেয়ে শেষ পর্যন্ত বাসে ময়মনসিংহ বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছায় দলটি। সেখান থেকে অটোরিকশায় ময়মনসিংহ রেলস্টেশনে এসে আবার বিলম্বিত যমুনা এক্সপ্রেসের জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষা। ট্রেনের এই দীর্ঘ অপেক্ষার সময়টুকু বন্ধুরা অলস বসে না থেকে রেলস্টেশনের প্রথম শ্রেণির বিশ্রামাগারে (ফার্স্ট ক্লাস ওয়েটিং রুম) দারুণ এক আড্ডায় মেতে ওঠেন। সারা দিনের স্মৃতি রোমন্থন আর খুনসুটিতে মুখর ছিল বিশ্রামাগারের প্রতিটি মুহূর্ত।

অবশেষে গভীর রাতে যমুনা এক্সপ্রেস পৌঁছালে সবাই ট্রেনে চড়ে বসেন। সারা দিনের দৌড়ঝাঁপ ও ঘোরাঘুরির তীব্র ক্লান্তিতে ফিরতি ট্রেনে প্রায় সবাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। রাত ১টা ৪৫ মিনিটে ট্রেনটি জামালপুর রেলস্টেশনে পৌঁছায়। শহরের প্রাণকেন্দ্র জামালপুর টাউন পাঁচ রাস্তার মোড়ে সমাপনী কথা ও বিদায়ী শুভেচ্ছা বিনিময়ের মধ্য দিয়ে সফল এই সফরের সমাপ্তি ঘটে। দীর্ঘ পথের ক্লান্তি ভুলে একরাশ সোনালি স্মৃতি ও বন্ধুত্বের নতুন গল্প নিয়ে নিজ নিজ ঠিকানায় ফিরে যান সবাই।

সহসাংগঠনিক সম্পাদক, জামালপুর বন্ধুসভা