রবীন্দ্র অনুষঙ্গ ও এক কাপ চা

দিনাজপুর বন্ধুসভার সাহিত্যের আসরছবি: বন্ধুসভা

২২ আগস্ট শনিবার এক কাপ চা, সঙ্গে পরিচিত কিছু মুখ আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ঘিরে গল্প–আড্ডাটা ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে সাহিত্য আড্ডার এক উষ্ণ আসর। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে কখনো রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য, কখনো প্রকৃতি, কখনো মানুষের মনুষ্যত্ব নিয়ে চলছিল আলোচনা। দিনাজপুর বন্ধুসভার বন্ধুদের সঙ্গে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় ৬০ জন শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে শহরের দয়ানন্দ লাইব্রেরিতে জমে ওঠে এই ব্যতিক্রমী আসর ‘রবীন্দ্র অনুষঙ্গ: এক কাপ চা’।

আলোচনার শুরুতেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে অংশগ্রহণকারীদের ভাবনা জানতে হাতে তুলে দেওয়া হয় চিরকুট। প্রশ্ন লিখে জমা দেন অংশগ্রহণকারীরা। সেই প্রশ্নগুলো ধরেই আলোচনায় প্রবেশ করেন রাজশাহীর গভ. ডিগ্রি কলেজের অধ্যাপক কামারুজ্জামান।

রবীন্দ্রনাথকে বুঝতে গিয়ে অধ্যাপক কামারুজ্জামান তুলে ধরেন তাঁর জীবনের নানা দিক। ব্রাহ্মধর্ম, জমিদারি তত্ত্বাবধান, ভ্রমণ এবং সেই অভিজ্ঞতার সঙ্গে তাঁর সাহিত্যচর্চার সম্পর্ক নিয়ে কথা বলেন তিনি। রবীন্দ্রনাথের জমিদারি তত্ত্বাবধানের সময় যে কয়েকটি অঞ্চলে তাঁর যাতায়াত ও অবস্থান ছিল, সেসব অভিজ্ঞতা তাঁর সাহিত্যজীবনেও নানা মাত্রা যোগ করেছিল।

দিনাজপুর বন্ধুসভার সাহিত্যের আসর।

আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পায় রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প। ‘পোস্টমাস্টার’, ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’-এর মতো গল্পের প্রসঙ্গ টেনে তাঁর গল্প বলার অসাধারণ ক্ষমতা তুলে ধরা হয়। উপন্যাসের ক্ষেত্রেও আলোচনায় আসে ‘গোরা’ ও ‘নৌকাডুবি’। রবীন্দ্রনাথ শুধু কবি নন, তিনি ছিলেন এক বহুমুখী প্রতিভা। গান, নাটক, ভ্রমণসাহিত্য, পত্রসাহিত্যসহ সাহিত্যের নানা শাখায় তাঁর বিচরণ ছিল স্বতন্ত্র। ক্লাসিক ধারার সাহিত্যচর্চার মধ্য দিয়েও তিনি নিজের সময়কে ছাড়িয়ে গেছেন।

তাহলে রবীন্দ্রনাথকে ‘বিশ্বকবি’ বলা হয় কেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আলোচনায় উঠে আসে তাঁর সাহিত্য ও চিন্তার বিস্তৃতি। দেশ, মানুষ, প্রকৃতি ও জীবনকে দেখার তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি কেবল একটি ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর সৃষ্টির ভেতর দিয়ে মানুষ ও মানবজীবনের সর্বজনীন অনুভূতিগুলো প্রকাশ পেয়েছে।

চায়ের আড্ডা তখন আরও গভীর হয়ে উঠেছে। এক কাপ চা শেষ হওয়ার আগেই আলোচনা পৌঁছে গেছে রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতি ও মানবতাবোধের কাছে।

দ্বিতীয় পর্বের আলোচনায় অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এনামুল হক রবীন্দ্রনাথ ও প্রকৃতির সম্পর্কের প্রসঙ্গ ধরে মানুষের পরিচয় ও মনুষ্যত্বের চর্চা নিয়ে কথা বলেন। তিনি মনে করিয়ে দেন, মানুষ প্রাণী হলেও তার বিশেষত্ব বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতায়। তাই শুধু জন্মসূত্রে মানুষ হলেই যথেষ্ট নয়, সত্যিকার অর্থে মানুষ হয়ে উঠতে হয়।

দিনাজপুর বন্ধুসভার সাহিত্যের আসর।

আলোচনায় উঠে আসে, ‘ম্যান ইজ আ র‍্যাশনাল অ্যানিমেল’। মানুষ প্রাণী, কিন্তু তার বুদ্ধি ও বিবেক তাকে অন্য প্রাণী থেকে আলাদা করে। সেই বোধকে কাজে লাগিয়েই মানুষের মধ্যে মনুষ্যত্ব গড়ে তুলতে হবে। অন্যের কল্যাণের কথা ভাবতে হবে, নিজের বাইরে অন্য মানুষের জন্যও দায়িত্ববোধ তৈরি করতে হবে।

‘বি আ পারসন, ডাই টু লাইভ’ ভাবনার মধ্য দিয়ে এনামুল হক বোঝান, নিজের সংকীর্ণ স্বার্থের বাইরে বেরিয়ে মানুষের জন্য বাঁচার মধ্যেই প্রকৃত সার্থকতা। ধর্ম ও মানুষের পরিচয় নিয়েও আলোচনায় আসে নানা প্রশ্ন। মানুষ যদি কেবল নিজের স্বার্থ, পরিচয় কিংবা বিভাজনের মধ্যে আটকে থাকে, তাহলে তার মনুষ্যত্ব কোথায়? মুক্ত হতে হলে, মানুষ হয়ে ওঠার অর্থই–বা কী?

আলোচনার শেষ দিকে দয়ানন্দ লাইব্রেরির প্রতিষ্ঠাতা সনৎ চক্রবর্তী বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথ যেন শুধু বইয়ের পাতায় থাকা কোনো কবি বা সাহিত্যিক নন, তিনি হয়ে উঠেছেন মানুষকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার এক অনন্ত অনুষঙ্গ। তাঁর প্রকৃতিপ্রেম, মানবতাবোধ ও জীবনদর্শন নতুন করে ভাবতে শেখায়—মানুষ হওয়া শুধু একটি পরিচয় নয়, এটি প্রতিদিনের চর্চা।

সভাপতি, দিনাজপুর বন্ধুসভা