বীর মুক্তিযোদ্ধার কণ্ঠে একাত্তর, দিনাজপুর বন্ধুসভার স্মৃতিচারণা অনুষ্ঠান

দিনাজপুর বন্ধুসভার উদ্যোগে মুক্তিযোদ্ধার কণ্ঠে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোনার আয়োজনছবি: বন্ধুসভা

মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণা ও আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে দিনাজপুর বন্ধুসভা। ‘রণাঙ্গনের দিনগুলি’ শিরোনামে ১২ অক্টোবর সদর উপজেলার সুইহারী এলাকার দয়ানন্দ সাধারণ গ্রন্থাগারের নজরুল চর্চা কেন্দ্রে এটি অনুষ্ঠিত হয়। বন্ধুসভার বন্ধু এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিশু-কিশোরদের উপস্থিতিতে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, সাহসিকতা ও আত্মত্যাগের গল্পে মুখর হয়ে ওঠে পুরো আয়োজন।

সাধারণ সম্পাদক বিপ্লব চন্দ্র রায়ের সঞ্চালনায় স্বাগত বক্তব্য দেন সভাপতি শবনম মুস্তারিন। অনুষ্ঠানে একাত্তরের রণাঙ্গণের স্মৃতি তুলে ধরেন ৭ নম্বর সেক্টরের বীর মুক্তিযোদ্ধা করুণাকান্ত রায়। এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধকালীন দিনাজপুরের ইতিহাস, গণহত্যা ও শহীদদের আত্মত্যাগ নিয়ে আলোচনা করেন কবি ও গবেষক বিধান দত্ত।

বীর মুক্তিযোদ্ধা করুণাকান্ত রায় তাঁর স্মৃতিচারণায় মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘বৃষ্টির দিনে সিরাজগঞ্জ থেকে শিলিগুড়ির পানিহাটার উদ্দেশে রওনা হই প্রশিক্ষণ নিতে। সেখানে এক মাস যুদ্ধের কলাকৌশল শিখে ফিরে এসে দিনাজপুরে যুদ্ধে অংশ নিই।’

অতিথিদের উত্তরীয় পরিয়ে সম্মাননা জানানো হয়
ছবি: বন্ধুসভা

করুণাকান্ত রায় জানান, তাঁদের দলে ১১ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। ‘রাকিব ভাই’ নামে পরিচিত একজন তাঁদের কমান্ডার ছিলেন। দিনের বেলা তাঁরা সাধারণ মানুষের মতো বিভিন্ন বাড়িতে অবস্থান করতেন, আর রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযান চালাতেন। শত্রুপক্ষকে দুর্বল করার লক্ষ্য নিয়ে তাঁরা ১১টি আক্রমণ পরিচালনা করেন।

যুদ্ধের দিনগুলোর স্মৃতি তুলে ধরে করুণাকান্ত রায় জানান, ৬ জানুয়ারি বোমা বিস্ফোরণের মাত্র ৪৫ মিনিট আগেও তিনি মহারাজা এলাকায় ছিলেন। পরে বেতার ও মহারাজা স্কুলে বিজয়ের খবর শোনার স্মৃতিও তুলে ধরেন তিনি। যুদ্ধের সঙ্গীদের কথা বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা। তাঁর স্মৃতিচারণায় উপস্থিত নতুন প্রজন্মের সামনে উঠে আসে মুক্তিযুদ্ধের কঠিন দিনগুলো এবং দেশকে স্বাধীন করার জন্য বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অসীম সাহস ও ত্যাগের কথা।

কবি ও গবেষক বিধান দত্ত মুক্তিযুদ্ধকালীন দিনাজপুরের বিভিন্ন ঘটনা, গণহত্যা ও শহীদদের আত্মত্যাগের ইতিহাস তুলে ধরেন। তিনি রাজবাড়ী, রানীগঞ্জ, কাটাপাড়াসহ বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞের প্রসঙ্গ আলোচনা করেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ–পরবর্তী সময় দিনাজপুরে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞ, ২৭ মার্চ মুক্তিযোদ্ধাদের কুঠীবাড়িতে আক্রমণ এবং ২৮ মার্চ দিনাজপুরকে মুক্তাঞ্চল ঘোষণার ঘটনা। পরে ১৩ এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনী তিন দিক থেকে বিপুল অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আক্রমণ চালায় এবং প্রতিশোধমূলক হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত করে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

দিনাজপুর বন্ধুসভার উদ্যোগে মুক্তিযোদ্ধার কণ্ঠে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোনার আয়োজন।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণে নিজের গবেষণার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বিধান দত্ত বলেন, শহীদদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে তিনি তাঁদের স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করেছেন এবং ‘রাজবাটী হত্যাকাণ্ড’ বইয়ের মাধ্যমে সেসব ইতিহাস তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। আলোচনায় উঠে আসে, রূপকুমারের পরিবার হারানোর কথা, নাট্যকর্মী সুকুমার বিশ্বাসের কথাও। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, রাস্তায় স্লোগান দেওয়ার সময় পাকিস্তানি সেনাদের হাতে প্রাণ হারান সুকুমার বিশ্বাস।

এ ছাড়া দক্ষবালার মর্মান্তিক ঘটনাও তুলে ধরেন তিনি। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে স্বজনেরা ভারতে চলে গেলেও প্রতিবন্ধী দক্ষবালা তাঁদের সঙ্গে যেতে পারেননি। পরে পাকিস্তানি সেনারা তাঁকে হত্যা করে এবং তাঁদের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় বলে তিনি জানান।

বিধান দত্ত বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরা এবং পরিচিত-অপরিচিত সব শহীদের স্মৃতি সংরক্ষণ করা জরুরি। যাঁদের নাম ইতিহাসের পাতায় স্থান পায়নি, তাঁদের অবদানও নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।

এ ছাড়া অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথি মোসাদ্দাক হোসেন বন্ধুসভার সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার স্মৃতি তুলে ধরে এ ধরনের আয়োজনের প্রশংসা করেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও বীরত্বগাথা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন।

আলোচনা শেষে অতিথিদের উত্তরীয় পরিয়ে সম্মাননা জানানো এবং উপহারসামগ্রী প্রদান করা হয়। সমাপনী বক্তব্যে সনৎ চক্রবর্তী মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরতে বন্ধুসভার এ ধরনের উদ্যোগকে সাধুবাদ জানান এবং অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।