সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনাসহ দেশের উত্তরাঞ্চলে ব্যাপক বন্যা দেখা দিয়েছে। স্মরণকালের এই ভয়াবহ বন্যায় সিলেট বিভাগের অধিকাংশ অঞ্চল পানির নিচে তলিয়ে গেছে। প্রাণ হারিয়েছেন অসংখ্য মানুষ। অনেকের বাড়িঘর পানিতে ভেসে গেছে। কেউ আশ্রয় নিয়েছেন বাড়ির ছাদে। আর যাঁদের বিকল্প উপায় নেই, তাঁদের জায়গা হয়েছে বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে। মানবিক এই সংকটে বসে নেই বন্ধুসভার বন্ধুরা। কেউ একা, আবার কেউ দল বেঁধে মানুষের সহায়তায় ছুটে যাচ্ছেন। যেসব বন্ধু কাজ করছেন, তাঁদের মধ্যে অনেকের বাড়িতেও বন্যার পানি উঠেছে। তবু দমে যাননি। বিপদে বন্ধুদের মধ্যে তারুণ্যের শক্তি যেন আরও কয়েক গুণ বেড়েছে।

১৭ জুন দ্বিতীয় দফায় সিলেট অঞ্চলে হঠাৎ করেই পানি বেড়ে যায়। তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা ও বন্ধুদের করণীয় নিয়ে জরুরি বৈঠক ডাকে সিলেট বন্ধুসভা। কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের সহায়তা করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা হয়। এরপর বন্ধুরা নিজেদের বাড়িতে ফিরে যান প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আনতে। গিয়ে দেখেন, অনেকের বাড়িতে এরই মধ্যে পানি উঠে গেছে। সেই দৃশ্য দেখেও অন্যদের সহায়তায় এগিয়ে আসতে দ্বিতীয়বার ভাবেননি বন্ধুরা। এমনটাই মুঠোফোনে জানিয়েছেন সিলেট বন্ধুসভার সভাপতি হুমাইরা জাকিয়া। প্রতিদিনই মানুষের কাছে ছুটে যাচ্ছেন বন্ধুরা। ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে কথা বলছেন, কার কী প্রয়োজন, সেসব শুনছেন এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিচ্ছেন।

১৯ জুন সিলেট সদর উপজেলার বাদাঘাট মডেল স্কুল আশ্রয়কেন্দ্রে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঠাঁই হয়েছে দেড় বছরের শিশু রুনা আক্তারের। খাবারের অভাবে ও পেটের ক্ষুধায় তার কান্না ছুঁয়ে যায় বন্ধুসভার বন্ধুদের হৃদয়। প্রথম আলো এ নিয়ে একটি প্রতিবেদন করে। এরপরই কুষ্টিয়া বন্ধুসভার বন্ধুরা সবাই মিলে রুনার পরিবারের জন্য পাঁচ হাজার টাকা পাঠান। সিলেট বন্ধুসভার মাধ্যমে সেই টাকা রুনার পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি রুনার জন্য খাবার ও তার পরিবারের জন্য খাদ্যসামগ্রী নিয়ে যান বন্ধুরা। বাড়িতে মায়ের বুকের দুধের পাশাপাশি আটা ও ময়দা দিয়ে বানানো বিশেষ খাবার খেত রুনা। আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার পর তা আর দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কেবল বুকের দুধে পেট ভরছিল না তার। এখন বন্ধুদের দেওয়া খাবার পেয়ে কান্না থেমেছে রুনার।

একই অবস্থা অন্যান্য আশ্রয়কেন্দ্রেরও। ত্রাণের শুকনা খাবার খেয়ে যুবক ও বয়স্করা কোনোরকমে বেঁচে থাকলেও বিপাকে আছে শিশুরা। অনেক শিশু এসব খাবার খেতে চাচ্ছে না। মিষ্টি ও দুধজাতীয় খাদ্য হলে ভালো হয়। এমন পরিস্থিতিতে ২০ জুন সিলেট সদর উপজেলার বাদাঘাট মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ আশ্রয়কেন্দ্রে যান সিলেট বন্ধুসভার বন্ধুরা। প্রথম আলো ট্রাস্টের সহযোগিতায় আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নেওয়া ১৫০ শিশুর হাতে মিনি হরলিক্স, গ্লুকোজ, লেক্সাস বিস্কুট, এনার্জি প্লাস বিস্কুট, কোকোনাট বিস্কুট, গুঁড়া দুধের প্যাকেট, খাওয়ার স্যালাইন, মিনি কেক, সুজি, সাবানসহ বিভিন্ন শিশুখাদ্যসামগ্রী তুলে দিয়েছেন। এসব পেয়ে শিশুদের মুখে ছিল আনন্দের হাসি, উচ্ছ্বাস ছিল দেখার মতো।

অনেক বন্ধু একা একাই ছুটে যাচ্ছেন মানুষের দুয়ারে। তাঁদেরই একজন শাহ সিকান্দার শাকির। সিলেট বন্ধুসভার এই বন্ধুকে তাঁর এমন কাজের জন্য এখন অনেক মানুষ চেনেন। কোনো দুর্যোগ নেমে এলে বিপদে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়াতে তাঁর মুহূর্ত বিলম্ব হয় না। এবারও বন্যায় প্রতিদিনই অসহায় মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়াচ্ছেন। রাস্তায় কোমরসমান পানি, কোথাও যাওয়ার মতো পরিবহন নেই, তাতেও দমে যাওয়ার পাত্র নন এই বন্ধু। পানি উপেক্ষা করে বৃষ্টিতে ভিজে, কাঁধে ত্রাণের প্যাকেট নিয়ে হেঁটে চলে যাচ্ছেন। আবার নৌকায় ত্রাণ নিয়ে সেগুলো প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে দিচ্ছেন।

প্রথম আলো বন্ধুসভার বন্ধুদের এমন কাজের মাধ্যমে সবার মধ্যে তারুণ্যের শক্তি ছড়িয়ে যাক। একেকজন বন্ধু যেন মানবতার ফেরিওয়ালা। তাঁদের কাজের মাধ্যমে অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফিরে আসুক। শিশুরা ফিরে পাক তাদের আনন্দময় শৈশব। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ুক মানবতার জয়গান।

কার্যক্রম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন