সিঙ্গাপুরে ছোটদের উৎসবে

বিজ্ঞাপন
default-image

মাস তিনেক আগের কথা। এশিয়ান ফেস্টিভ্যাল অব চিলড্রেনস কনটেন্ট-২০১৮–তে যোগ দিতে ঢাকা থেকে উড়াল দিলাম সিঙ্গাপুরের উদ্দেশে। উৎসব ৬ থেকে ৮ সেপ্টেম্বর। সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে। এ উৎসব বিশ্বের বিভিন্ন দেশের লেখক, প্রকাশক, শিল্পী ও নির্মাতার মিলনমেলা। বাংলাদেশ থেকে একাই যোগ দিয়েছি আমি। দেশ ছাড়ার আগে অনলাইনে সিঙ্গাপুর সম্পর্কে কিছুটা ধারণা নিয়েছি! ইউটিউবে সিঙ্গাপুর সিটি ঘুরেছি। কিন্তু সরাসরি যখন সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি এয়ারপোর্টে নামলাম তখন সব কেমন কেমন লাগতে শুরু করল। যা দেখি তাই ভালো লাগে। এয়ারপোর্ট থেকে ইন্টারনেট প্যাকেজসহ সিম কিনে নেট ওপেন করি। তারপর মেট্রোরেল ধরে বুগিসের উদ্দেশে পা বাড়াই। এই বুগিস স্টেশন থেকে পায়ে হাঁটা দূরত্বে সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল লাইব্রেরি। ৪ তারিখ দুপুরেই পৌঁছে যাই গন্তব্যে।

ফেসবুক অফিসে অ্যারোনের নিমন্ত্রণ
অনুষ্ঠান ৬ তারিখ থেকে শুরু। হাতে দেড় দিন সময়। মেসেজ পাঠালাম অ্যারোনকে। তাঁর বাড়ি হংকং। সিঙ্গাপুরে অ্যারোনের বান্ধবী লেখালেখি করেন। সেই সূত্রে ২০১৭ সালে আমাদের পরিচয়। আর অ্যারোন এখন চাকরি করেন ফেসবুকের সিঙ্গাপুর অফিসে। মেসেজ পাঠানোর কয়েক সেকেন্ড পরেই অ্যারোনের উত্তর। তিনি সিঙ্গাপুরে ফেসবুক অফিস ঘুরে দেখার আমন্ত্রণ জানালেন। চটজলদি তা লুফে নিলাম। ৫ সেপ্টেম্বর বিকেলে অ্যারোনের দেওয়া তথ্য ধরে চলে গেলাম ৭ স্ট্রেইট ভিউ, ওয়েস্ট টাওয়ার, মেরিনা ওয়ানের রিসিপশনে। এ কী! অ্যারোন আমার অপেক্ষায় বসে আছেন। ঘড়ির ছোট কাঁটাটি যখন ‘৪’-এর ঘরে তখন অ্যারোন আমাকে নিয়ে লিফটে উঠলেন। এই মেরিনা ওয়ানের নাম অনেক শুনেছি। স্থাপত্যশৈলীর জন্য জগৎজোড়া খ্যাতি। অনেক পুরস্কারও জিতেছেন মেরিনা ওয়ান। অ্যারোন নিজ দায়িত্বে ওয়েস্ট টাওয়ারের লিফটের বাটন চাপলেন। আমরা উঠে গেলাম ১৮তলায়। নাম এন্ট্রি করলাম। আগেই আমার তথ্য দেওয়া ছিল। নাম এন্ট্রির পর ছবিসহ ডিজিটাল আইডি কার্ড দেওয়া হলো। সেই কার্ড গলায় ঝুলিয়ে পা বাড়ালাম। সুসজ্জিত ফেসবুক অফিস। সামনে এগোতোই চোখে পড়ল ইনস্টাগ্রামের ইয়া বড় টিভি। এত বড় টিভি দেখে অবাক হইনি। কারণ ফেসবুক নিজেই তো তার সৃষ্টি আর কাজ দিয়ে আমাদের অবাক জগৎ থেকে অনেক দূরে টেনে নিয়ে গেছে। টিভির পর্দা থেকে চোখ টেনে নিয়ে গেল সাগর। ফেসবুক অফিসের কাচের দেয়াল গলিয়ে দৃষ্টি চলে যায় নীল সাগরে। অন্য রকম ভালোলাগা খেলা করে মনে। এর ভেতর অ্যারোন হাতে ধরিয়ে দেয় মার্কার। ইশারা করে ফেসবুক ওয়ালের দিকে। ফেসবুক আর গুগলে অনেক ছবি দেখেছি এই ওয়ালের। এবার নিজেই সেই সাদা ওয়ালের সামনে দাঁড়ানো। কী লিখব? ভাবনার কিছু নেই। বাংলায় লিখে দিলাম—ভালোবাসি বাংলাদেশ! ফেসবুক ওয়ালজুড়ে ইংরেজির ছড়াছড়ি। কেবল একটা লেখাই বাংলা। তখন নিজের ভাষার জন্য খুব গর্ব অনুভব হয়। ফেসবুক অফিসে এসে পড়েছে শেষ বিকেলের আলো। যাকে বলে, কনে দেখা আলো। সেই আলোরও একটা ভাষা আছে। সবকিছু কেমন অন্য রকম হয়ে ধরা দেয় এই আলোতে। মিটিংরুম, গেস্টরুম, ট্রেনিংরুম, সবুজ বাগান ঘুরিয়ে অ্যারোন এনে বসিয়ে দিলেন লাইক হাউসে। তারপর নিজেই ছবি তুলে দিলেন আমার। সন্ধ্যা নেমে এসেছে বাইরে। কিন্তু ফেসবুক অফিসে আলোর ঝলকানি। সেই আলোতে ‘ভালোবাসি বাংলাদেশ’ লেখাটা রেখে এলাম।

default-image

ছয় ঋতু ও গোল্লাছুট
৬ তারিখ শুরু হলো এশিয়ান ফেস্টিভ্যাল অব চিলড্রেনস কনটেন্ট-২০১৮। চলল ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। তিন দিন টানা বিভিন্ন সেমিনার, ক্লাস, ডিসকাশন, পার্টিতে অনেকটা হাঁপিয়ে উঠেছি। এর ভেতর অস্ট্রেলিয়ার জুলি গ্রিন, ইন্দোনেশিয়ার আফিয়ন ত্রিশ্চিয়ান, মালয়েশিয়ার নোভেল আকবর, কেনিয়ার ওয়াকানি হফম্যান, ভারতের মনিকা, আমেরিকার মার্ক চেকলে, ইসরায়েলের মত্তি অভিরামের সঙ্গে আমার খুব ভাব হলো। সময় পেলেই আমরা একসঙ্গে গল্প করি। তাঁদের ছোটবেলার গল্প শুনি। তাঁদের দেশের ছোটদের মজার ঘটনা বলেন। শিশুসাহিত্য নিয়ে নানা পরিকল্পনার কথা বলেন। সব শুনি। শুনতেই ভালো লাগে। একসময় তাঁরা আমাদের ছোটদের গল্প শুনতে চান। বলি, আপনাদের মতো আমাদের ছোটরা অত সুযোগ-সুবিধা না পেলেও তারা অনেক ভাগ্যবান। বলেন, ‘কীভাবে?’ বলি, আমরা প্রাকৃতিকভাবে ছয়টি ঋতু পেয়েছি। আমাদের ছোটরা বর্ষা এলেই ব্যাঙের সঙ্গে মিতালি করে। বৃষ্টি গায়ে মেখে রবীন্দ্রনাথের গান গায়। বর্ষায় আমাদের নদীগুলো জলে একাকার হয়ে যায়। ছোটরা সেই নদীর পাড়ে জল-কাদায় এখনো ফুটবল, কাবাডি, গোল্লাছুট খেলে। তাঁরা সবাই অবাক হয় আমার কথা শোনেন। বলেন, ‘বাহ, তোমাদের দেশে তো যেতে হয়!’ আমি বলি, সব সময় আমাদের ছোট্ট সোনালি দেশ তোমাদের বরণ করে নিতে প্রস্তুত। তারপর তাঁদের বাংলাদেশ সরকারের ওয়েবসাইট খুলে দেখাই। তাঁরা অভিভূত হয়।

মিউনিখ ইন্টারন্যাশনাল ইয়ুথ লাইব্রেরির লুসিয়া ওবি
লুসিয়া ওবি, জার্মান ইলাস্ট্রেটর ও সংগ্রাহক। পাশাপাশি কাজ করেন মিউনিখ ইন্টারন্যাশনাল ইয়ুথ লাইব্রেরিতে। প্রথম দিন থেকে তাঁর সঙ্গে ভাব জমে। লুসির সংগ্রহে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বই থাকলেও বাংলা ভাষার কোনো বই নেই। তাই তিনি আমার পিছু নেন। ৮ তারিখ ডিনারে তাঁকে তিনটি বই উপহার দিলাম। তিনি বলেন, ‘এবারের উৎসবে সবচেয়ে বড় পাওয়া হচ্ছে বাংলা বই।’ কারণ তিনি জানেন বাংলা ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছিল বীর বাঙালিরা। বই হাতে নিয়ে লুসি বলেন, ‘ধরো, ১০০ বছর পর একজন বাঙালি মিউনিখ ইন্টারন্যাশনাল ইয়ুথ লাইব্রেরিতে এসে বাংলা ভাষার বই খুঁজে পেল; তার কেমন লাগবে তখন?’ আমি নিজেও এমন করে ভাবিনি বিষয়টা। তাঁর কথা শুনে বাংলা ভাষার জন্য গর্ব অনুভব করলাম।

উৎসবে যোগ দেওয়ায় বিভিন্ন প্রকাশকের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেয়ে যাই। কলকাতা থেকে প্রকাশিত আমার ছোট্ট একটা মা শিরোনামের বইটি ইংরেজিতে প্রকাশ করার আগ্রহ জানায় এক প্রকাশক। বইয়ের অনুবাদক অনুপা রয়। পরে প্রকাশকের সঙ্গে প্রাথমিক চুক্তিও হয়ে যায়। এ ছাড়া বেশ কয়েক দেশের প্রকাশকের সঙ্গে কথা হয়। তাঁরাও বই প্রকাশের আগ্রহ প্রকাশ করেন। উৎসবে এটাও আমার জন্য অনেক বড় প্রাপ্তি। বাংলাদেশ থেকে খুব কম লেখকই অংশগ্রহণ করেন এ উৎসবে। শুধু লেখক নয়; এ উৎসবে চাইলে যে কেউ অংশগ্রহণ করতে পারেন। কীভাবে? www.afcc.com.sg লিংকটায় ক্লিক করে। বিশ্বে শিশুসাহিত্যর চর্চা এবং এর বিকাশসহ শিশুসাহিত্যের ভাষা কোন দিকে মোড় নিচ্ছে; এর কিছুটা হলেও ধরতে পারবেন এ উৎসবে যোগ দিলে। ঘুরে এসে নিশ্চয়ই আপনিও জানাবেন কেমন লাগল আপনার।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন