মিতালি আপার চাকরি চলে যাওয়ার পর আমাদের পরিবারে আর্থিক দুরাবস্থা নেমে এল। আপার বেতন আর আব্বার পেনশনের টাকায় বলতে গেলে আমাদের পরিবার চলছিল। প্রায় ৩০ বছর সরকারি কর্মচারী হিসেবে চাকরি করার পর আব্বা যখন ২ বছর আগে অবসর নিলেন, আম্মা তখন অবশ্য বলেছিলেন, চলো গ্রামে ফিরে যাই।
কী করে যাই, বলো তো? মিতালি বছরখানেক আগে চাকরিটা পেল আর ঝুমু তো মাত্র অনার্সে ভর্তি হলো। দুইটা মেয়ে শহরে একলা রেখে মা–বাবা বুঝি গ্রামে গিয়ে বসে থাকবে। আব্বার ঘোর আপত্তির মুখে আম্মা আর কিছু বললেন না।
একটা বেসরকারি ব্যাংকে আপা জুনিয়র অফিসার হিসেবে চাকরি পেয়েছিল। ব্যাংকের আর্থিক লোকসানের কারণে অবশ্য ছয় মাস ধরেই আপা শুনেছিল যে লোক ছাঁটাই করা হবে। অবশ্য আপা নির্ভয়ে ছিল, কারণ তার কথা হলো, সে যদি সৎ ও পরিশ্রমী হয়, কারও সাধ্য নেই তাকে বিদায় করার। যেদিন জরুরি মিটিংয়ে ছাঁটাই করা ২৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম ঘোষণা করা হলো, সেদিন আপা তার নাম শুনে প্রথমে বিশ্বাস করতে পারেনি, পরে অবশ্য বুঝতে পেরেছিল যে সবই লোক দেখানো, অনেক আগেই ছাঁটাই হওয়াদের তালিকা তৈরি হয়ে গিয়েছিল। সিনিয়র কর্মকর্তা আদনান ভাই, যে কিনা আপাকে পছন্দ করত, সে সেদিনই আপাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু আপা হাসিমুখে না করে দিয়েছিল। সেই বিষয়ে আব্বা, আম্মা বা আমি কোনো কিছুই জিজ্ঞেস করিনি।
আব্বা আমাদের দুই বোনকে ডেকে একটা কথা প্রায়ই বলতেন, বুঝলি রে মিতালি-ঝুমু, তখন ৮২-৮৩ সাল, ঢাকায় নতুন এসেছি। কিছুই বুঝতাম না। তোদের দাদার থেকে শখানেক টাকা নিয়ে ঢাকায় এসেছি। এক বন্ধুর মেসে উঠলাম। ম্যাট্রিক পাস করা মানুষ, তত বড় চাকরির আশাও করিনি। আর তখন ঘুষ দিয়ে চাকরি কিংবা নেতা-পাতিনেতাদের কমিশন না দিয়ে ব্যবসাও চলত না। আবেদন করলাম , চাকরিটা হয়ে গেল। বিয়ে করলাম, তোরা এসে আমার ঘরটা ভরিয়ে দিলি। সব সময় একটা কথা মনে রাখবি, হয়তো সমাজে তোদের সততার মূল্য না–ও পেতে পারিস, কিন্তু নিজেকে ভালোবাসার ক্ষমতা থাকবে। অসৎ মানুষ কখনো নিজেকে ভালোবাসতে পারে না। নিজেকে ভালোবাসা না গেলে দেশকে ভালোবাসবি কী করে?
পরিবারে অত সচ্ছলতা না থাকলেও আমরা সুখী ছিলাম। তবে আত্মীয়স্বজনের টাকার গরম দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে গেলে আমরা পারিবারিক অনুষ্ঠানগুলো এড়িয়ে চলা শুরু করলাম। বিয়ে-জন্মদিনে কে কী পরল, কে কাকে কী উপহার দিল, এসব জানার ইচ্ছা আমাদের কখনোই ছিল না। এখন আবার মিতালি আপার বিয়ে নিয়ে তাদের যেন ঘুম নেই। সেদিন বড় চাচি এসে মাকে অনেক কথা শুনিয়ে গেল। আমি তখন সবে ক্লাস শেষে এসেছি। সারা দিনের ক্লান্তির শেষে চাচির কথাগুলো যেন কাঁটার মতো গায়ে লাগল। কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারলাম না, আম্মা ইশারায় নিষেধ করলেন বলে।
শোনো, মিতালির মা, তোমরা আমাদের পর মানুষ ভাবলে কী হবে, আমরা তো কাছের মানুষ। রক্তের সম্পর্ক কি মুছে ফেলা যায়?
না, তা নয়, ভাবি। ব্যস্ততার কারণে আমাদের আসা-যাওয়া কমে গেছে।
থাক, আর ব্যস্ততার অজুহাত দিয়ো না। তা মিতালির বিয়ের ব্যাপারে কী করলে? প্রেম-ট্রেম করে নাকি? আজকালকার ছেলেমেয়েদের ওপর আমার একটুও ভরসা নেই।
না, মিতালি বা ঝুমু কেউই এমন না।
কিছু মনে কোরো না, একটা কথা বলি, আমরা কাছের মানুষ, তাই কিছু বলি না, কিন্তু বাইরের মানুষ তো আর কথা বলা থামাবে না।
মানে, বুঝলাম না ভাবি!
বলি আর কত দিন মেয়েটাকে ঘরে বসিয়ে রাখবে? এত দিন মেয়েটার চাকরি ছিল। ওর বেতন দিয়ে সংসার চলল। এখন যেহেতু চাকরি নেই, বিয়েটা দিয়ে দাও না। পরে বয়স্কা মেয়েকে বিয়ে করবে কে?
কথাটা শুনে আম্মার চোখে যেন জল চলে এল। কোনোরকমে বললেন, হ্যাঁ, ভালো পাত্র পেলেই মেয়েটার বিয়ে দেব।
শোনো, আমার এক বান্ধবীর ছেলে আছে। বিদেশ গিয়ে ভালো টাকা কামিয়েছে। তোমরা বললে আলাপ করে দেখতে পারি।
জি, দেখেন। আম্মা মলিন মুখে বললেন।
চাচিকে আম্মা দুটি কমলা খেতে দিয়েছিলেন। তিনি একটা খেয়ে আরেকটি ব্যাগে ভরে নিয়ে গেলেন। আমি হাসলাম আর ভাবলাম যে টাকা হয়েছে ঠিকই, মনটা ছোটই রয়ে গেছে।
আপা পত্রপত্রিকা দেখে একটার পর একটা চাকরির জন্য আবেদন করতে লাগল। কোনোটার ক্ষেত্রে ডাক আসে, সব পরীক্ষা দেওয়ার পর ঘুষের আবদার শুনে আপা ফিরে আসে। আবার কোনোটায় নাকি আগে থেকে লোক নেওয়া হয়ে গেছে। মিতালি আপার ধৈর্য দেখে আমারও ভীষণ ক্লান্তি লাগে। আগে আমি দুইটা টিউশনি করতাম, নিজের পড়াশুনার খরচ নিজে চালাতাম। এখন আরও একটা করা বাড়িয়েছি; মাস শেষে আম্মার হাতে কিছু গুঁজে দেই। তবে মাঝেমধ্যে মনে হয় যে আরও কিছু করা দরকার। এত বিষণ্নতা ভালো লাগে না। আব্বা-আম্মা রাতে ঘুমিয়ে গেলে আগে আমি আর আপা মৃদুস্বরে গান গাইতাম, গল্প করতাম। এখন শুধু চাকরির কথাই ওঠে।
শোন, আব্বা-আম্মাকে এখনই বলিস না। ঠিক করেছি যে আমি ব্যবসা করব।
মানে? টাকা কোথায় পাবে? আর কিসের ব্যবসা?
ভাবছি যে ফুটপাতে ভ্যানগাড়িতে খাবার বানিয়ে বিক্রি করব। আমার বান্ধবী নীলিমাকে তো চিনিসই, ও কিছু টাকা ধার দেবে।
কী বলছ তুমি? আব্বা-আম্মা কি রাজি হবে?
তাই তো তোকে বললাম এখন না বলতে। পরে আমি তাদের বুঝিয়ে বলব। এখন তুই ঘুমা, কাল সকালে তোর ক্লাস আছে।
পরদিন বিকেলে ক্লাস থেকে এসে দেখি যে খাবার টেবিলে একটা ছোট্ট মিষ্টির প্যাকেট রাখা। আম্মা আপার চাকরি পাওয়ার কথা বলল। আমি সব জেনেও চেপে গেলাম।
আপার চাকরি হয়েছে শুনে বড় চাচি আবার বাড়িতে এলেন বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে।
শোনেন ছোট ভাই, ছেলের মা–বাবাকে অনেক কষ্টে রাজি করিয়েছি। তারা আপনার বড় মেয়েকে দেখতে চায়।
মিতালি কী বলে? শুনে দেখি।
তা শুনে আর কী করবেন? আমি একটা আনুমানিক তারিখ দিয়ে দিচ্ছি জুন মাসের ১০ তারিখ। আপনি, ভাবি, মিতালি, ঝুমু আমার বাড়িতে চলে আসবেন। সেখানেই ছেলের পরিবার আসবে। আপনাদের এখানে তো বসার ভদ্র পরিবেশ নেই।
চাচির কথা শুনে আব্বা-আম্মা আর কোনো উত্তর দিলেন না। চাচি চলে যাওয়ার পর আপা ক্ষিপ্ত হয়ে বললেন, উনাকে বাড়িতে আসতে না করে দেবে। কোনো দিন তো একটা ভালো কথা মুখ দিয়ে বেরুল না। আর আমি এই বিয়েতে রাজি না। তাকে জানিয়ে দিয়ো।
শোন রে মা, ভদ্রতা নিজে না শিখলে যেচে পড়ে শেখানো যায় না। ওনার সাথে তর্ক করতে যাওয়া মানে নিজের শান্তি নষ্ট ছাড়া আর কিছুই না। তোর মাকে বলে দেব ‘না’ করে দিতে। তুই চিন্তা করিস না। আব্বার কথা শুনে আপা আর আমি খুশি হলাম। আসলেই আব্বার মতো আব্বা পাওয়া মুশকিলের ব্যাপার!
আপা রোজ সকালে বের হয়ে তার বান্ধবী রিমার বাসায় বাজার-সদাই করে রাখে, দুপুর গড়ালে বিক্রি শুরু করে। শ্যামলীর শিশুপার্কের সাথে লাগোয়া এক রাস্তার পাশে তার ভ্যানগাড়িতে করে চিকেন ফ্রাই, আলুভাজা, মানে শহুরে ভাষায় ফ্রেঞ্চ ফ্রাই বিক্রি করে। প্রথম প্রথম অনেক নেতিবাচক কথাও আপার শুনতে হয়েছে, তবে ঠান্ডা মাথায় সব সামলেছে।
আমাদের পরিবারে আবার শান্তি ফিরে এল। আপা যেন আমাদের মুখে হাসি ফিরিয়ে এনেছে। শুক্রবার ছাড়া সপ্তাহের ছয় দিন আপা রাত আটটা পর্যন্ত খাবার বিক্রি করে। একদিন রাতে খাবার সময় আব্বা একটা খবর দিল। খবরটা শুনে আমরা মহাবিপদ থেকে বেঁচে গেছি—এটা বুঝতে পারলাম।
ভাবি যে ছেলেটার প্রস্তাব এনেছিল মিতালির জন্য, সেই ছেলেকে শুনলাম দুদিন আগে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে।
কী বলো তুমি? আম্মা শঙ্কিত স্বরে বললেন।
হ্যাঁ, শুনলাম বিদেশে মানব পাচার করত। পুলিশ অনেক দিন ধরে চক্রটাকে ধরার চেষ্টা করছিল, অবশেষে ধরতে সক্ষম হয়েছে।
তা কোথা থেকে জানলে?
কোথায় আবার? ভাইসাব ফোন দিয়েছিল। বলল যে ভাবিকে এ বিষয়ে আর জিজ্ঞেস না করতে।
শুনে আম্মা, আপা, আমি তিনজনই মুচকি হাসলাম।
একদিন হঠাৎ আদনান ভাইয়ের ফোন এল।
ঝুমু, অনেক কষ্টে তোমার নম্বর জোগাড় করেছি। আমি মা–বাবাসহ বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে তোমাদের বাসায় আসতে চাই।
জি, আমি আব্বা-আম্মা, আপাকে বলব।
আমি ইতিবাচক ফলাফলের আশ্বাসেই থাকলাম। আপাকে বলতেই সে রাজি হয়ে যায়। আমি অবশ্য কিছুটা অবাক হলেও আপার মুখে হাসি দেখে খুশি হলাম। যেদিন আপাকে দেখতে আসবে, সেদিন ওকে সুন্দর করে সাজিয়ে দিলাম। আপাও যে অনেক সুন্দর, সেটা প্রথম খেয়াল করলাম।
বেয়াইসাব মেয়েকে ডাকেন, আদনান ভাইয়ের মা বলল।
ঝুমু, তোর আপাকে নিয়ে আয় তো। আব্বার ডাক শুনতেই আমরা দুজন ধীরগতিতে গিয়ে পাশাপাশি রাখা দুটো চেয়ারে বসলাম। আপার ঘোমটা সরাতেই আদনান ভাইয়ের বাবা চেঁচিয়ে উঠলেন।
এই মেয়ে, তুমি রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে খাবার বিক্রি করো তো। তোমাকে মনে হয় দেখেছিলাম আমি।
কিছুক্ষণ সুনসান নীরবতার পর আপা মুখ খুললেন, জি, আপনি ঠিকই দেখেছেন। আমি নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছি। পরিবারের হাল ধরেছি। এটা নিশ্চয়ই দোষ হয়ে যায়নি।
হ্যাঁ, মোটেই দোষ হয়নি। যদিও আমি বিষয়টা প্রথম জানলাম। তবে আমি সব সময় মিতালির সঙ্গে আছি। মিতালির মতো মানুষই সমাজের আর বাকি দশটা মানুষের জন্য উদাহরণ। সম্পদ, চেহারা কিংবা বংশ আর কতকাল বিয়ের জন্য মানদণ্ড হবে? আমরা না হয় সাহস, দায়িত্ববোধ, পরিবারের প্রতি তুমুল ভালোবাসাকেই সামনে আনতে চেষ্টা করি। কী বলো, মিতালি? তোমার চিরসঙ্গী করবে কি আমায়?
আদনান ভাইয়ের কথা শুনে আমরা সবাই হাততালি দিয়ে উঠলাম। বিয়ের সানাই বাজতে বুঝি আর দেরি নেই।

ফার্মেসি বিভাগ, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0