এক.
২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর চীনের উহান প্রদেশে যে ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব হয়েছিল, সেই করোনা কোভিড–১৯ ভাইরাস মার্চ মাসে পৃথিবীজুড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। মুক্ত বিশ্বের অবাধ বাণিজ্যনির্ভর চলাচলের ফলে করোনাভাইরাস চীন থেকে ইতালি, ইতালি থেকে ফ্রান্স, স্পেন, জার্মানি, যুক্তরাজ্যসহ গোটা ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা মধ্যপ্রাচ্যসহ সবখানে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে।

দুই.
ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি প্যারিসে খবর আসছিল, ইতালির মিলান ও ভেনিস শহরে করোনা রোগীর সংখ্যা একটু একটু করে বাড়ছে। সেখানে রোজ একটু একটু করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে কিন্তু সরকার বিশেষ কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না। করোনাকে তারা স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছে বলে মনে হচ্ছিল। কিন্তু ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ফ্রান্সেও করোনা রোগী একে একে বাড়তে থাকে। ওদিকে ইতালির মিলান, ভেনিস, বোলোনিয়াসহ একে একে বেশ কটি পর্যটন নগরী লক ডাউন হয়ে যায়। তবু ফ্রান্স সরকারের সেদিকে খুব একটা নজর ছিল বলে অনুমান করা যায় না।
ফ্রান্সে করোনা পরিস্থিতি মহামারি আকার ধারণ করার পর রাষ্ট্র কিছু উদ্যোগ নেবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মনে হচ্ছিল, খুব দেরি হয়ে যাচ্ছে। আমরা সাধারণ মানুষ, আতঙ্কিত হয়ে ভাবতেই পারি, প্যারিস লকডাউন করা হোক। কিন্তু রাষ্ট্র কি তা সহজেই পারে? প্যারিসে দুই কোটির অধিক মানুষের বসবাস। এই শহরে প্রতিদিন আরও এক কোটির অধিক পর্যটক আসেন আর ফিরে যান। প্যারিস শহরে দুটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, শহরের পাশে আরেকটি বিমান অভ্যন্তরীণ বন্দর। প্রতি মিনিটে এই শহরে একটি বিমান নামে ওঠে। শহরের পাঁচটি আন্তর্জাতিক রেলস্টেশনে রোজ কত শত ট্রেন ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে আসে। প্যারিসে ইন্টারন্যাশনাল বাসটার্মিনালও ১০টির ওপরে। বিশ্বের সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে খ্যাত প্যারিসকে লকডাউন করা তো মুখের কথা নয়।
তবু সবকিছুর ওপরে, সব বাণিজ্যের ওপরে মানুষের প্রাণ। প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ জাতির উদ্দেশে দুই দফা ভাষণ দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছেন সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ক্যাফেবার, রেস্তোরাঁ, স্টেডিয়াম, থিয়েটার, সিনেমা হলসহ নিত্যগুরুত্বহীন সব বিপণিবিতান। ১৪৪ ধারা জারির মাধ্যমে আমরা এখন গৃহবন্দী। খাদ্যসামগ্রী, ওষুধ কেনা, ডাক্তার দেখাতে যাওয়া ইত্যাদি জরুরি কাজ থাকলে অনলাইন থেকে ডাউনলোডের পর ফরম পূরণ করে বাইরে যাওয়ার কারণ দর্শানোর সার্টিফিকেট তৈরি করেই বাড়ি থেকে বেরোতে হয়। বিশেষ কারণ ছাড়া বাড়ির বাইরে বেরোলেই পুলিশ ধরতে পারে এবং ১৩৫ ইউরো পর্যন্ত জরিমানা করতে পারে।

তিন.
ইতালির মতো ফ্রান্সেও এখন মৃত্যুর মিছিল। একেকটি হাসপাতালের মর্গে কটি মরদেহ রাখা যায়? একেকটি হাসপাতালে কটি আইসিইউ কেবিন থাকে? ফ্রান্সে করোনাভাইরাস কোভিড–১৯-এ আক্রান্তের সংখ্যা ১৫ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। এরই মধ্যে মারা গেছেন পাঁচ শতাধিক নাগরিক।

চার.
ফ্রান্সে কোন দেশের কতজন অভিবাসী করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন এই তথ্য কখনো জানা যাবে না। এখানে কঠোরভাবে রোগীর পরিচয় গোপন রাখা হয়। আমরা একটু বেশি উৎসুক, উদ্বেগ আক্রান্ত মানুষ। ফরাসি দেশের আইন কানুনের বাইরে গিয়েও জানতে চেষ্টা করি কজন বাংলাদেশি আক্রান্ত হয়েছেন। সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে ফ্রান্স চরম ক্ষতির মুখে পড়েছে। এই ক্ষতি ও ক্ষত সারিয়ে উঠতে কত বছর লাগবে আমরা অনুমানও করতে পারি না। কেউ কেউ বলছেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসতে আরও তিন মাস লাগতে পারে।
তবু আমরা ফ্রান্সপ্রবাসীরা খাদ্য, চিকিৎসা, বাসস্থান, পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিল নিয়ে দুশ্চিন্তা করছি না। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়েল ম্যাখোঁ ফ্রান্সবাসী সবার দায়িত্ব নিয়েছেন। যতদিন জরুরি অবস্থা থাকবে, ততদিন ঘরে থেকেও আমরা বেতনের ৮০ ভাগ পাব, কাজ না থাকলে সোশ্যাল সিকিউরিটির পুরো টাকাই পাব। তাছাড়া এ দেশে সব সময়ই নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য শিক্ষা ও চিকিৎসা সম্পূর্ণ ফ্রি। করোনা দুর্যোগে কোনো জিনিসের দাম এক টাকাও বাড়েনি। হ্যান্ড স্যানিটাইজার এবং ডিজইনফেকশন লিক্যুইড কয়েক দিন দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠেছিল, এখন তা আগের মতোই সহজপ্রাপ্য হয়ে গেছে।

পাঁচ.
চীনের উহান প্রদেশের করোনা প্রাদুর্ভাবের আড়াই মাস পরে ইরান এবং ইতালিতে ভাইরাসটি ধীরে ধীরে একেকজন সদ্য চিনফেরত মানুষের শরীরে দেখা দিতে থাকে। এবং সংখ্যাটা যখন দুই থেকে ২০০ পর্যন্ত গড়ায়, তখনো ইরানে ও ইতালিতে টনক নড়ে না। যে মানুষগুলোর সঙ্গে চিনের কোনো সম্পর্ক নেই, অথচ করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন এমন খবর বেরোতেই হইচই শুরু হয়ে যায়। ততদিনে ইরানে এবং ইতালিতে আক্রান্তের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে গেছে এবং করোনা রোগীরা হাসপাতাল থেকে বেঁচে ফিরতে পারছেন না, মৃত্যুর মিছিলও শুরু হয়ে গেছে। একে একে ইরানের তেহরান লকডাউন হয়ে যায়। লকডাউন হয়ে যায় ইতালির ভেনিস ভো লোম্বর্দি মিলান বোলোনিয়া।
করোনাভাইরাসের রোগী শনাক্ত হতে থাকে ফ্রান্সেও। মধ্য ফেব্রুয়ারিতে ফ্রান্সে আক্রান্তের সংখ্যা তিন থেকে শুরু হয়। পরপর কয়েক দিন তিনজন–চারজন করে বাড়তে থাকে। ইতালির মতো ফ্রান্সের জনগণ এবং সরকার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয় না। কিন্তু প্যারিসের নিকটবর্তী ওয়াজ এবং মুলুজ শহরে করোনা–আক্রান্তের সংখ্যা যখন ৩০০ ছাড়িয়ে যায়, তখন ফরাসি সরকারের টনক নড়ে। প্রেসিডেন্টের কপালে ভাঁজ পড়তে থাকে।
আমরা পরিচিত ফরাসি বন্ধু–বন্ধুনিদের সঙ্গে হাগ করি। এটাই এ দেশে শিষ্টাচার। একটু–আধটু পরিচিত ঘনিষ্ঠ কারও সঙ্গেই দেখা হলে উত্তর ফ্রান্সে দুবার এবং দক্ষিণ ফ্রান্সে তিনবার গালে গাল ঠেকাতে হয়। যদি বয়স্ক কোনো মাতৃপিতৃস্থানীয় কারও সঙ্গে দেখা হয়, বেশ শব্দ করে চুম্বনের ভঙ্গিতেই তাঁরা হাগ করেন। এই সব ফরাসি শিষ্টাচার সংস্কৃতি, আনন্দফুর্তি আচমকা বিলুপ্ত হয়ে যায় প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়েল ম্যাখোঁর জরুরি অবস্থা ঘোষণায়।
মধ্য মার্চ থেকে ফ্রান্স হয়ে ওঠে করোনার আতঙ্ক দেশ। রোজ ৭০০–৮০০ মানুষ করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন, মারা যাচ্ছেন ৬০ থেকে ৭০ জন। অর্থাৎ করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। ফ্রান্সের ৬ কোটির অধিক মানুষকে নিরাপত্তা দিতে বিশ্বের সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে খ্যাত প্যারিসসহ সারা দেশ লকডাউনের আওতায় পড়ে যায়।
১৭ মার্চ ২০২০-এর দুপুর ১২টা থেকে ১৪৪ ধারা জারি হওয়ার আগেই আমি প্যারিস থেকে আমাদের স্থায়ী প্রবাসবাটি আলেস শহরে ফিরে আসি। প্যারিস থেকে আলেসের দূরত্ব প্রায় হাজার কিলোমিটার। কিন্তু ৩০০ থেকে ৩২০ কিলোমিটার গতির টিজিভি ট্রেনে তিন সাড়ে তিন ঘণ্টায় আমরা আলেস–প্যারিস যাতায়াত করি। সকাল ছয়টা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত প্রতি ঘণ্টায় প্যারিস থেকে নিম হয়ে আলেসে আসার ট্রেন পাওয়া যায়। ফলে প্যারিস–আলেসের দূরত্ব এখন আর আমার মাথায় কাজ করে না।

ফেব্রুয়ারির ১৫ তারিখ থেকে আজ ২২ মার্চ রাত আটটা পর্যন্ত ফ্রান্সে এযাবৎ করোনাভাইরাস নভেল কোভিড–১৯-এ আক্রান্ত হয়েছেন ১৬০১৮ জন। এযাবৎ মারা গেছেন ৬৭৪ জন। আজ পর্যন্ত সুস্থ হয়েছেন ২২০০ জন। এবং মরণাপন্ন অবস্থায় আছেন ১৭৪৬ জন।
ফ্রান্স সরকার যদি জরুরি অবস্থাটা আর এক সপ্তাহ আগেও ঘোষণা করত তাহলে ফ্রান্সের করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেত না। উত্তর ফ্রান্সের কোনো কোনো হাসপাতাল ধারণক্ষমতার বাইরে চলে গেছে বলে সেখান থেকে কিছু কিছু রোগীকে বিশেষ বিমানে করে দক্ষিণ ফ্রান্সের হাসপাতালে স্থানান্তর করা হচ্ছে। করোনা-কার্ফ্যু জারির আগে ও পরে

আগে আমরা অবাধে চলাফেলা করতাম। ক্যাফে, রেস্তোরাঁয়, থিয়েটারে, সিনেমায় একসঙ্গে বসে তুমুল আড্ডা দিতাম। ফ্রান্সে কারও সামনে ঢেকুর তোলা যায় না, কিন্তু সবার সামনে টিস্যু চেপে শব্দ করে নাক ঝাড়তে সমস্যা হতো না। ফরাসিরা হাত না ধুয়েই শুকনো খাবার খান। কফির সঙ্গে ক্রোয়াসাঁ খাওয়ার জন্য কেউ টিস্যু পেপার দিয়েও হাত মোছেন না। কিন্তু এখন?
১৪৪ ধারা অনুসারে আমরা এখন গৃহবন্দী। বিশেষ কারণে বাড়ির বাইরে যেতে হলে নেট থেকে ডাউনলোডের পর ফরমে নির্দিষ্ট কারণ এবং নিজের নাম–ঠিকানা লিখে কারণ দর্শানোর সার্টিফিকেট প্রিন্ট কপি নিয়ে বেরোতে হয়। রাস্তায় বের হলেই পুলিশ চেকিং হয়। সঙ্গে সমর্থনযোগ্য কারণ দর্শানোর সার্টিফিটেক না থাকলে ১৩৫ ইউরো জরিমানা হতে পারে। অতএব এখন ফ্রান্সের প্রতিটি মানুষ সাবধান, সচেতন। এখন আমরা কেউ কারও কাছে ঘেঁষি না। এক মিটার থেকে দুই মিটার দূরত্ব রেখে চলাচল করি। রাস্তায় দুজন একসঙ্গে হাঁটতে পারি না। সুপার শপে গিয়ে চিহ্নিত কালো দাগের বাইরে এক থেকে দুই মিটার দূরে দাঁড়াতে হয়। প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে দাম দেওয়ার সময়ও কাউন্টারে একাধিক ক্রেতা দাঁড়াতে পারেন না।
ডাকঘর এবং ব্যাংকে গেলেও সব কাজ উপস্থিত কর্মীর সহায়তায় নিজে নিজে করতে হয়। ডাকঘর এবং ব্যাংকের কেউ ইউরোর নোট অথবা কয়েন স্পর্শ করেন না। মুখে মাস্ক এবং হাতে গ্লাভস পরে কর্মীরা এক মিটার দূরে দাঁড়িয়ে যা বলেন আমাদের তাই শুনতে হয়। সব কাজ হয় অটো মেশিনে। চিঠি বা কোনো ডুকমেন্ট পোস্ট করতে হলেও অটোমেশিনে ওজন করে কার্ড থেকে পেমেন্ট করে ডাক টিকিট নিতে হয়। চিঠির খাম বা প্যাকেট কোনো ডাককর্মী স্পর্শ করেন না। এখন আর কোনো মেটার বক্সে চিঠি ফেলা যায় না, রাখতে হয় নির্ধারিত বেত বা কাঠের ট্রেতে।
এই মুহূর্তে ফ্রান্সের প্রতিটি মানুষ সতর্ক। করোনা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য আমরা সব আইন মানতে বাধ্য।

ফ্রান্সে গণপরিবহনের সংখ্যা এই মুহূর্তে অর্ধেকে নামিয়ে আনা হয়েছে। সাধারণ বাসে দুই দরজা এবং ১০৮ সিটের বাসে চার দরজা। প্রথম দরজার পাশেই চালক। চালকের সামনের দরজা দিয়ে যাত্রী ওঠানামা বন্ধ। আলেসে অতি জরুরি দরকারে বাইরে গেলে বাসে উঠি দ্বিতীয় দরজা দিয়ে। এখন বাসের টিকিট লাগছে না। একেক জন যাত্রী থেকে এক মিটার দূরত্ব বজায় রাখতে হচ্ছে। অবশ্য আলেসের বাসে আমি এখন সহযাত্রী পাই না। গতকাল শহর থেকে দূরের কোরা মার্কেট থেকে ফেরার সময় বাসে উঠে দেখি একজন যাত্রীই আছেন, তিনি আমার পরিচিতা। আমি বাসে উঠতেই তিনি ভুল করে আমার দিকে এগিয়ে আসছিলেন, চালক বলে উঠলেন, না না, কেউ কারও কাছে যাবেন না।

আমি যদি মনে করি আমার শরীরে করোনা উপসর্গ দেখা দিচ্ছে; যদি শরীরের তাপমাত্রা ৩৮ ছাড়িয়ে যায়, শুকনো কাশিসহ গলা ব্যথা হয়, মাংসপেশি ব্যথা করে, দুর্বল লাগে, শ্বাসকষ্ট হয়, তাহলে আমরা ১৫ নম্বরে ফোন করতে পারি। ফোনালাপে গুরুত্ব বুঝে একজন চিকিৎসক এবং তিন–চারজন চিকিৎসাকর্মী আমাকে আরও দু–একদিন সবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার পরামর্শ দেবেন অথবা সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে নিয়ে যাবেন।

আসুন, আমরা করোনাভাইরাসের আশঙ্কা থেকে মুক্ত হই। নিজে সচেতন হই এবং অন্যদের সচেতন করে তুলি।

লেখক, আবৃত্তিকার
বন্ধুসভার প্রাক্তন উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য
ফ্রান্সপ্রবাসী
২২-০৩-২০২০

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0