নায়কের মা
‘মিজান, তুমি স্ক্রিপ্ট তো দিলা না’।
‘অ্যান্টি, সব রেডি আছে। আসলেই পেয়ে যাবেন। দেরি করবেন না। রওনা হয়েছেন’?
‘এই যে, বের হচ্ছি। মালিবাগ থেকে উত্তরাই তো। সিএনজিতে দুই-তিন ঘণ্টার বেশি লাগবে না’।
মালিহা বেগম সিএনজির জন্য দাঁড়িয়ে আছেন। অনেক দিন এই যানটাতে চড়া হয় না। হাতে কাজ নেই ছয় মাস হয়ে গেল। ছোট মেয়েটাকে নিয়ে তাঁর সংসার। স্বামী নেই ছয় বছর। মেয়েটা একটা বেসরকারি কলেজের প্রভাষক। ‘বাস’ই এখন তাঁদের পারিবারিক যান।
ঢাকায় আজ জ্যাম খুব বেশি নেই। সিএনজির চালকটা ভালোই টেনে যাচ্ছে।
‘খালাম্মা, একটা কথা কই। কিছু মনে কইরেন না’।
‘হ্যাঁ, বলো’।
‘আপনাকে কোথায় যেন দেখছি। টিভিতে মনে হয়। ভুল কইলাম’?
‘দেশি চ্যানেল তো এখন কেউ দেখে না। সব জলসা, সিরিয়াল।। আমাকে দেখলা কীভাবে’?
‘ঠিক কইছেন। আমিও জলসা দেখি। তবে আপনাকে দেখছি মনে হয়। মোশারফ করিমের মা হইছিলেন না আপনি’?
‘তাই নাকি? হবে হয়তো। এখন তো আর কেউ ডাকে না আমাকে, আমাদের’।
দীর্ঘশ্বাসটা বাতাসে মিলতে মিলতে গাড়িটা থামে উত্তরার খুব পরিচিত একটা ভবনের সামনে। সবাই বলে ‘শুটিং বাড়ি’। ভীরু পায়ে মালিহা বেগম ভেতরে ঢোকেন। নিচতলায় শুটিং হচ্ছে। বিজ্ঞাপন হবে মনে হয়। নাকি ‘মিউজিক ভিডিও’? কাউকে চেনা লাগছে না তাঁর। মিজান বলেছে সোজা তৃতীয়তলায় চলে যেতে। সেখানে গিয়ে দেখেন তেমন কেউ এখনো আসেনি।
‘মিজান, আমি তো এসে পড়েছি। লোকজন কই’?
‘ও, আসছেন? এই আমি আসছি। মনা বলে একটা ছেলে আছে। আমি ফোন দিচ্ছি। চা দিবে আপনাকে’।
ফাঁকা ফ্ল্যাটটায় একা বসে মালিহা বেগম তাঁর শুটিংজীবনের একটার পর একটা ছবি সামনে দেখতে পান। দেশ মাত্রই স্বাধীন হয়েছে। তাঁর বয়স তেরো–চৌদ্দ হবে হয়তো। বাবা ভর্তি করে দিয়েছিলেন গানের স্কুলে। সুবীর কাকু একদিন বললেন, ‘কিরে, তোরা টিভিতে গান গাবি’? সুবীর কাকু সিনেমার গানের সুর করেন।
জানুয়ারির সন্ধ্যাবেলা। জীবনে প্রথম ক্যামেরার সামনে। মালিহা ঘামছে দরদর করে। আরও দশটা মেয়ের সঙ্গে সে গান গাইছে, ‘পৌষ তোদের ডাক দিয়েছে, আয়রে ছুটে আয়, আয়, আয়’।
মিজান এসে গেছে। মালিহা বেগম হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন।
‘আমার স্ক্রিপ্ট কই, মিজান’?
‘অ্যান্টি, আমাদের পরিচালক অনেক আধুনিক। আপনাকে সিকোয়েন্সটা বুঝিয়ে দেবে। সংলাপ নিজের মতো করে বলবেন। আপনি সিনিয়র আর্টিস্ট। আপনার আবার স্ক্রিপ্ট লাগে নাকি’?
মালিহা বেগম এসব খুব অপছন্দ করেন। আশি–নব্বইয়ের দশকে বিটিভিতে একটার পর একটা নাটকে অভিনয় করে গেছেন তিনি। চেহারাটা নায়িকা নায়িকা ছিল না তাঁর। নায়িকার বান্ধবী, নায়কের বোন, পাশের বাড়ির মেয়ে, পরে ভাবি, ছোট চাচি চরিত্রের অভাব হয়নি তাঁর। বাঘা বাঘা সব প্রযোজক সবাই। চিত্রনাট্য নিয়ে এক মাস, দুই মাস ধরে সেকি মহড়া! দিন যেত রামপুরায়, রাত নামত রামপুরায়। আর এখনকার ছোকরা কী বলে এসব!
‘তা স্ক্রিপ্ট না হোক, আমার চরিত্রটা কী, বলবা তো’?
‘আপনি নায়কের মা। নায়ক–নায়িকা বিয়ে করে আলাদা ফ্ল্যাটে থাকে। নায়কের একটা পরকীয়া আছে। ডিভোর্স হয়ে যাবে অবস্থা। আপনি নায়ক, মানে ছেলেকে বোঝাবেন, এসব ভালো না। এই আরকি’।
চরিত্র শুনে মালিহা বেগম চুপসে যান। এত হালকা চরিত্রও তাঁকে করতে হবে ভাবেননি কোনোদিন। আবার তিনি চলে যান নব্বইয়ের দশকে। নতুন নতুন প্যাকেজ নাটক হচ্ছে। প্রথম তিনি ‘মা’ চরিত্রে অভিনয় করছেন। চুলে তখন সাদা রং দিতে হতো। এখন তাঁর কোনো কালো চুল নেই। সেই দিনও চলে গেছে।
সন্ধ্যা হয়ে গেছে। নায়ক এখনো আসেনি। দুপুরে দুইটা শিঙ্গাড়া আর চা দিয়েছিল স্পটবয়। খিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে। একটু কি বাইরে গিয়ে ভাত খেয়ে আসবেন? মেকআপ যদি নষ্ট হয়? এসব ভাবতে ভাবতে আটটার দিকে নায়ক এসে পড়ে।
‘ভাই বসেন। এসিটা বাড়িয়ে দে’, হুলুস্থুল পড়ে যায়।
‘আরে, গাজীপুর থেকে আসছি রাত ৩টায়। সামনের ঈদে ৪০টা নাটক যাবে আমার। আর পারি না। দেখি, তোমাদেরটা শেষ করে যাই। সিকোয়েন্স কী’?
সিকোয়েন্স শুনে নায়ক তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে।
‘ঘণ্টার নাটক বানানো শিখছ। ছেলেরে বুঝাইতে মা’র সামনে আসার দরকার কী? ফোন নাই? রাস্তার ফকিরও তো ফোনে কথা বলে, আর তোমরা? আমার নাটকে কোনো মা, বাবা চরিত্র থাকবে না, বুঝছো? এমনি বাজেট নাই, বাজেট নাই কর, আবার রাখছে নায়কের মা চরিত্র। ক্যামেরা রেডি কর। আমি ফোনে কথা বলার সিন কইরা দেই। পরে মহিলা ভয়েস বসাইয়া দিও। দুই ঘণ্টার বেশি আমি সময় দিব না’।
‘ভাই, আপনি জিনিয়াস। আপনি যেভাবে বলেন সেভাবেই হবে। ওই ক্যামেরা রেডি কর’।
বাস যাচ্ছে মালিবাগের দিকে। মালিহা বেগমের হাতে একটা বিস্কুটের প্যাকেট। মিজান ছেলেটা মুখ কাঁচুমাচু করে কিছু টাকা আর এই প্যাকেট হাতে ধরিয়ে দিয়েছে। তাঁর ক্ষুধা মরে গেছে। এখন খাবার নামবে না গলা দিয়ে। মালিহা বেগমের চোখে জল। তাঁর ইচ্ছে করছে হাউমাউ করে কাঁদতে।
শুকনো চোখে গ্লিসারিন লাগিয়ে কান্নার চেয়ে চোখভর্তি জল আটকে রাখার অভিনয়টা অনেক কষ্টের করে দিয়েছেন বিধাতা।
মাতুয়াইল, ঢাকা।