ভিয়েতনাম যুদ্ধের প্রাক্কালে ৬০–এর দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কলেরা জীবাণুর মাধ্যমে জীবাণুযুদ্ধের বিস্তারের জন্য ব্যাপক গবেষণা করছিল ঢাকার মহাখালীর সিয়োটা কলেরা ল্যাবরেটরিতে, যা বর্তমানে আইসিডিডিআরবি নামে বিশ্বখ্যাত।
এই শতাব্দীর প্রথম দশক থেকে সার্স-করোনাভাইরাস সংক্রান্ত গবেষণা চলছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের উহানের গবেষণাগারে। জনশ্রুতি আছে, জীবাণুযুদ্ধে ভাইরাস ব্যবহারের উপযোগিতা পরীক্ষা ছিল মূল লক্ষ্য।
কথিত আছে, প্রাণী থেকে করোনাভাইরাস গত নভেম্বর মাসে মানুষে সংক্রমিত হয়। সার্স ভাইরাস ৩৮৪ বার পরিবর্তিত হয়ে নভেল করোনা কোভিড-১৯ রূপে আত্মপ্রকাশ করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ রোগকে কোভিড-১৯ নামকরণ করে ২০২০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি এবং কোভিড-১৯ মহামারি হিসেবে ঘোষণা দেয় ১১ মার্চ।

কোভিড-১৯ অন্যান্য ভাইরাস থেকে অপেক্ষাকৃত বড় এবং ভয়ানক ছোঁয়াচে, মানুষ থেকে মানুষে অতিদ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এক রাষ্ট্র থেকে অন্য রাষ্ট্রে ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ প্রবাসী নাগরিকদের দেশে প্রত্যাবর্তন, বিনোদন বা পরিজনের সঙ্গে সময় যাপনের জন্য আগমন।
কোভিড-১৯–এর উপসর্গগুলো: জ্বর, কফ-কাশি, হাঁচি, মাংসপেশির ব্যথা, গলাদাহ, যা দুই থেকে ১৪ দিনের মধ্যে ফুসফুসের সমস্যা সৃষ্টি করে। দ্রুত চিকিৎসা না হলে স্পঞ্জি ফুসফুস শ্লেটের মতো শক্ত হয়ে যায়।

এ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে চীন, কোরিয়া, ইরান, ইতালি, স্পেন ও ফ্রান্সে। বাংলাদেশে প্রমাণিত কোভিড-১৯ রোগী এখন পর্যন্ত ২৪ জন এবং মারা গেছেন দুইজন। বাংলাদেশে এ রোগে আক্রান্তদের সংখ্যা যে লাফিয়ে বেড়ে যাবে না তার নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবে না। তবে সংক্রমণ প্রতিরোধের জন্য দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশে কোভিড-১৯–এর প্রবেশদ্বার ও মোকাবিলায় করণীয়:
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের চার হাজার কিলোমিটারের বেশি সীমান্ত রয়েছে। বিভিন্ন পথে ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করা যায়। প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষ যাতায়াত করে। কয়েক শ ভারতীয় ট্রাক বাংলাদেশে প্রবেশ করে। পুরো বিষয়টির ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সক্ষমতা অর্জন করা দরকার। প্রয়োজন কঠোর স্ক্রিনিং। ভারতীয়রা বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পারলেও, ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশিরা দেশে ফিরছেন। স্ক্রিনিং ঠিকমতো না হওয়ায় বিপদের আশঙ্কা বাড়ছে।

বাংলাদেশের সব কারাগারের মিলিত বন্দী ধারণক্ষমতা ৪০ হাজারের চেয়ে কিছু বেশি। কিন্তু, রাজনৈতিক হয়রানি, পুলিশের ঘুষ বাণিজ্য ও আইন শৃঙ্খলার অবনতির কারণে কারাবন্দী আছেন প্রায় ৯০ হাজার। কারাগারের জনাকীর্ণতা কোভিড-১৯–এর জন্য উন্মুক্ত দ্বার সৃষ্টি করতে পারে। প্রতিকার হিসেবে সরকারের উচিত হবে ফাঁসির আসামি, যাবজ্জীবন ও ১০ বৎসরের অধিক দণ্ডপ্রাপ্ত ছাড়া অন্য সব দণ্ডপ্রাপ্ত অভিযুক্তদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে মুক্তি দিয়ে দেওয়া এবং বুঝিয়ে বলা পরিবারের বাইরে যেন বেশি বিচরণ না করেন।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বাড়ানো প্রয়োজন। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো অত্যন্ত জনাকীর্ণ এবং ক্যাম্পে সাধারণ জীবন যাপনের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নেই। রোহিঙ্গারা যেন ক্যাম্পের বাইরে না আসে, সেদিকে যেমন লক্ষ রাখতে হবে, একইভাবে স্থানীয় জনসাধারণের ক্যাম্পে প্রবেশ সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

বাস-ট্রেনস্টেশন, বন্দর, বাজার ও লঞ্চঘাটে যাত্রীদের তাপমাত্রা পরীক্ষা করার উদ্যোগ নিন হাতে ধরা ইনফ্রারেড থার্মোমিটার দিয়ে। এবং বাড়িতে ফিরে সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত ধুতে হবে।

প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশের সমৃদ্ধির জোগানদার। প্রায় ১ কোটি প্রবাসীর মধ্যে ২৫ লাখ চিকিৎসক, ইঞ্জিনিয়ার, ফার্মাসিস্ট, আইটি পেশাজীবী, শিক্ষক, ব্যবসায়ী স্থায়ীভাবে বিদেশে বসবাস করেন। এঁরা তাঁদের উদ্বৃত্ত সম্পদ বিদেশে রাখেন। দেশে পাঠান না। বাকি প্রায় ৭৫ লাখ সাধারণ শ্রমজীবী প্রবাসী বাংলাদেশিরা প্রায় ১০০টি দেশে কঠিন শ্রম দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। প্রতি তিন-চার বছর পরপর তাঁরা স্ত্রী-পুত্র–পরিজন ও আত্মীয়দের দেখার জন্য দেশে ফেরেন ১০ থেকে ৪০ ঘণ্টা উড়োজাহাজে ভ্রমণ করে। কোভিড-১৯ সংক্রমণ প্রতিরোধে বিমানবন্দরে পৌঁছার পর তাঁদের কোয়ারেন্টিনে রাখা বিজ্ঞানসম্মত। তাঁদের আইসোলেশনের বৈজ্ঞানিক কারণ ভালোভাবে বুঝিয়ে দেওয়া, যাতে বাড়ির বাইরে ১৪ দিন ঘোরাফেরা না করেন।
সর্বোপরি, সামাজিক ও ব্যক্তিগতভাবে সব নাগরিককে সচেতন হতে হবে । সচেতনতামূলক সব প্রকার নিয়ম মেনে চলতে হবে।

তথ্য ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধুসভা
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0